দেশজুড়ে অগ্নিঝুঁকিতে ৩ হাজার ৯৩৮ ভবন, অতি ঝুঁকিতে ৬২২টি
ছবিঃ সংগৃহীত
২০২৫ সালে সারাদেশে ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস ৩ হাজার ৯৩৮টিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে চিহ্নিত করেছে; এগুলোর ৬২২টি আবার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ভবন। আগুনে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সংস্থাটি নিয়মিত পরিদর্শন চালিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা শনাক্তের এই কাজ অব্যাহত রেখেছে।
ভবন পরিদর্শনে গিয়ে যেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়, তার মধ্যে আছে জরুরি বহির্গমন পথ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ও ব্যবহার উপযোগী সিঁড়ি, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, পানির রিজার্ভার, স্প্রিংকলার, ফায়ার ডোর, প্রশিক্ষিত জনবল এবং ডেডিকেটেড ফায়ার অফিসার।
দেশের ভবনগুলো কাঠামোগতভাবে কতটা নিরাপদ ও দুর্যোগ-সহনশীল—সাম্প্রতিক সময়ে মৃদু ও মাঝারি মাত্রার একাধিক ভূমিকম্পের পর সেই প্রশ্ন আবার নতুন করে উঠেছে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে বিশেষভাবে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে শুধু অগ্নিনিরাপত্তা নয়, তার সঙ্গে ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব, কার্যকর জরুরি বহির্গমন পথ ও দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার সক্ষমতাও নিশ্চিত করা।
অগ্নিকাণ্ড, গ্যাস বিস্ফোরণ, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ও চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকি সাধারণত দেখা দেয় ভূমিকম্পের পরে। এ কারণে সমন্বিত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভবনের সার্বিক দুর্যোগ-সহনশীলতা নিশ্চিত হয়।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রের ভাষ্য, ভবন পরিদর্শনের সময় মূলত অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ই বিবেচনা করা হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং উইং না থাকায় সংস্থাটি ভবনের কাঠামোগত দিক সম্পর্কে কোনো মতামত বা সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। কোনো স্থাপনা ‘সন্তোষজনক’, ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ নাকি ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’—সেটি ঠিক করা হয় একটি নির্দিষ্ট চেকলিস্ট ধরে, যা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণে।
কোন ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, তা শনাক্ত করতে ফায়ার সার্ভিস কয়েকটি নির্দিষ্ট প্যারামিটার কাজে লাগায়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যবহারযোগ্য সিঁড়ি আছে কি না, সিঁড়ি ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ও বাধামুক্ত কি না এবং জরুরি মুহূর্তে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুব্যবস্থা আছে কি না—এগুলো তার মধ্যে পড়ে। মালামাল রেখে সিঁড়িতে চলাচলের পথ আটকে দেওয়া হলে তা সরাসরি ঝুঁকি বলে ধরা হয়।
অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ভবনে আছে কি না, সেগুলো কার্যকর কি না এবং তা চালানোর মতো প্রশিক্ষিত জনবল আছে কি না—পরিদর্শনের সময় এসবও দেখা হয়। অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে আরও ধরা হয় বহুতল ভবনে পর্যাপ্ত হোস পাইপ ও ফায়ার পাম্প না থাকা এবং দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরঞ্জাম অকেজো হয়ে যাওয়াকে।
কঠোরভাবে যাচাই করা হয় ভবনের আইনগত অনুমোদন ও লাইসেন্স-সংক্রান্ত বিষয়ও। কোনো ব্যবসা ফায়ার লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স কিংবা প্রয়োজনীয় অনুমোদন না নিয়ে চালানো হলে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়।
রাজউক অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে কোনো ভবনে বাড়তি তলা তোলা হলে সেটি ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায় ওঠে। এমন ভবনের ক্ষেত্রে গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয় বাড়তি তলাগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিঁড়ির সহজলভ্যতা ও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স আছে কি না।
ঝুঁকির মাত্রা ঠিক করার সময় ভবনের বজ্রপাত প্রতিরোধক (লাইটনিং অ্যারেস্টার), ছাদে থাকা ওভারহেড পানির ট্যাংক ও ভূগর্ভস্থ রিজার্ভারের ধারণক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলার জন্য পাম্প হাউসে ফায়ার পাম্প, অল্টারনেটিভ ডিজেল পাম্প ও জকি পাম্প অবশ্যই থাকতে হয়; কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এই পাম্প হাউস না থাকলে সেটিও বড় ধরনের ঝুঁকি।
পাশাপাশি বহুতল ভবনে স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার সিস্টেম ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ফায়ার ডোর আছে কি না এবং সিঁড়িপথ বাধামুক্ত কি না, সেটিও যাচাইয়ের আওতায় পড়ে। ভবনের ঝুঁকির স্তর মূলত ঠিক হয় বিএনবিসি মেনে প্রয়োজনীয় অগ্নি নির্দেশনা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং সরঞ্জাম কতটা কার্যকর, তার ভিত্তিতে।
২০২৫ সালে পরিদর্শন করা ১০ হাজার ৫৩৩টি স্থাপনা নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান বলছে, এর ৬ হাজার ৫৯৫টি সন্তোষজনক, ৩ হাজার ৩১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ৬২২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত। এগুলোর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবন ৬৫২টি; তার ৪৪২টি সন্তোষজনক, ১৮৫টি ঝুঁকিপূর্ণ আর ২৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ।
৪৭৩টি আবাসিক ভবনের মধ্যে সন্তোষজনক পাওয়া গেছে ২৬১টি, ঝুঁকিপূর্ণ ১৯০টি ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ ২২টি। পোশাকশিল্প কারখানা ছিল ১ হাজার ৫৩৩টি; এর ৮৫৩টি সন্তোষজনক, ৫৯২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৮৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
পোশাকশিল্পের বাইরের ৭২০টি কারখানার ক্ষেত্রে সন্তোষজনক ৪৩৪টি, ঝুঁকিপূর্ণ ২৫১টি ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৩৫টি। আর ১ হাজার ৫৩টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ৫৪৫টি সন্তোষজনক, ৪৩২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৭৬টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ।
ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছিল ৪৮০টি—এর ৩২৮টি সন্তোষজনক, ১৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ, ১৯টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ১ হাজার ৭১টি রেস্টুরেন্টের মধ্যে সন্তোষজনক ৫৫৪টি, ঝুঁকিপূর্ণ ৩৭২টি এবং অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৪৫টি। শপিংমল ও মার্কেট ১ হাজার ১৭১টি; এগুলোর ৭২৩টি সন্তোষজনক, ৩৪৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ১০৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ।
৭৮৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৩৫টি সন্তোষজনক, ২২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ২৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। কেমিক্যাল গোডাউন ৯১টি; তার মধ্যে সন্তোষজনক ১১টি, ঝুঁকিপূর্ণ ৪২টি এবং অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি। ১০১টি ফিলিং স্টেশনের ক্ষেত্রে ৬৯টি সন্তোষজনক, ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ, ৭টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এর বাইরে অন্যান্য স্থাপনা ২ হাজার ৪০৪টি, যার ১ হাজার ৮৪০টি সন্তোষজনক, ৫২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৯টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমানের কথায়, ‘অনেক ভবন অনুমোদিত নকশা ও নিয়মকানুন যথাযথভাবে না মেনে নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণের পরও ভবনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ফায়ার হাইড্রেন্ট, ফায়ার এক্সটিংগুইশার, আগুন শনাক্তকরণ সেন্সর, ফায়ার ডোর ও জরুরি বহির্গমনের মতো ব্যবস্থা অনেক ভবনেই নেই।’
বাসস’কে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, ‘অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে আগুন লাগলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে। তাই অবকাঠামোর দিক থেকে যেমন ভবনকে নিরাপদ রাখতে হবে, তেমনি অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে।’
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘অগ্নিনিরাপত্তার সরঞ্জাম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। তাই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত মনিটর করা প্রয়োজন।’
তাঁর মতে, ‘বিএনবিসি অনুসরণ করে এবং ফায়ার সেফটি প্ল্যান গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে ভবন নির্মাণ করলে ভবনকে অগ্নিঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সংশ্লিষ্ট সবারই এ বিষয়ে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন।’