দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৮২ কোটি ডলার, বেড়েছে ২৯ শতাংশ
ছবিঃ সংগৃহীত
আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেড়েছে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের শুরুর দুই মাসে এ ঘাটতির অঙ্ক ঠেকেছে ৩৮২ কোটি ডলারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুলাই-আগস্টে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এ দুই মাসে রপ্তানি থেকে আয় এসেছে ৮৩৮ কোটি ডলার; এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
তবে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির মধ্যেও দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত বেড়েছে তিন গুণের বেশি। এক বছর আগের ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার থেকে এ সময়ে তা উঠেছে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। চলতি হিসাবের এই উন্নতির পেছনে প্রধানত কাজ করেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে জোরালো প্রবৃদ্ধি।
প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে ৫৮৩ কোটি ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৬ শতাংশ।
আগস্ট শেষে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ ৩ হাজার ৭৩৫ কোটি ডলার ছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ হিসাবপদ্ধতিতে এই রিজার্ভ ৩ হাজার ২৪৪ কোটি ডলার। এ অর্থে প্রায় ৫ দশমিক ২ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে।
জ্বালানি তেল আমদানির খরচে বড় লাফ এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বাড়তি ব্যয়—আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে এ দুটি বিষয়ই বড় ভূমিকা রেখেছে।
গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ হয়েছিল ১২৫ কোটি ডলার, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা হয়েছে ২৪৯ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এ খাতের আমদানি ব্যয় বেড়ে প্রায় দ্বিগুণে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি তেল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়াই সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বাড়ার মূল কারণ—এমনটাই বলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় ১১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আমদানি ব্যয় ১২ শতাংশ বাড়ার পেছনে এটাই মূল কারণ। তা ছাড়া ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য আমদানি ব্যয় বাড়েনি। ব্যালান্স অব পেমেন্টে কিছুটা চাপ লক্ষ করা যাচ্ছে।’
অন্যদিকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক থেকে এ সময়ে রপ্তানি আয় এসেছে ৭৪৯ কোটি ডলার; প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
আর্থিক হিসাবে অর্থের বহিঃপ্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত বাড়ার পরও দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনে চাপ কমেনি বলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের উল্লেখ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, রপ্তানির চেয়ে আমদানি বৃদ্ধির গতি বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বড় হয়েছে। আবার চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত বেড়েছে প্রবাসী আয়ের জোরালো প্রবৃদ্ধির সুবাদে। তিনি বলেন, ‘তবে আর্থিক হিসাবে অর্থের বহিঃপ্রবাহ আরও বেড়েছে। ফলে এ হিসাবের ঘাটতিও বেড়েছে।’
সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্টস) ঘাটতি বৃদ্ধির কারণ হিসেবে আর্থিক হিসাবের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার কথা বলেন জাহিদ হোসেন। এ জন্য তিনি প্রধানত দায়ী করেন মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অর্থছাড়ে ৬১ শতাংশ পতন এবং ট্রেড ক্রেডিটে ঋণাত্মক অবস্থানকে।
মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অর্থছাড় চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে নেমে এসেছে ২৯ কোটি ১০ লাখ ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ কম। এ দুই মাসে ঋণের আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৫৭ কোটি ২০ লাখ ডলার।
উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বিদেশি অর্থ ব্যবহারের পরিমাণও এ সময়ে কমে গেছে। তবে এর পেছনে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়াই মূল কারণ কি না, হাতে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের কাজ, অনুমোদন, দরপত্র ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় দেরি হলে যেমন বিদেশি অর্থের ব্যবহার কমতে পারে, তেমনি কিছু ঋণের সঙ্গে জুড়ে থাকা শর্ত পূরণ না হলেও প্রকল্পে তা কমে যেতে পারে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিলম্বিত প্রকল্পগুলো প্রত্যেক উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে পর্যালোচনা করে কোথায় সুনির্দিষ্ট বাধা রয়েছে তা সরকারের চিহ্নিত করা উচিত এবং সেসব বাধা দ্রুত দূর করা উচিত। পাশাপাশি প্রকল্পের অগ্রগতি ও অর্থছাড়সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
রপ্তানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্য ও বাজারের বহুমুখীকরণে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান ফাহমিদা খাতুন। সেই সঙ্গে প্রবাসী আয় যাতে বৈধ পথে আরও বেশি আসে, সে লক্ষ্যে উদ্যোগ জোরদার করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
সৌজন্যে: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড