চার শতাধিক নারীর সঞ্চয়ের প্রায় ২২ লাখ টাকা নিয়ে উধাও সমিতির ব্যবস্থাপক, খোকসায় মানববন্ধন
ছবিঃ সংগৃহীত
পেশায় ভিক্ষুক আমিনা খাতুন কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের পাইকপাড়া মির্জাপুর গ্রামের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নারী। জমানো টাকা হারানোর আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘আমি অসহায় নারী। কিডনির সমস্যা। অনেক কষ্ট করে ভিক্ষা করে এত দিন টাকাটা জমিয়েছিলাম। এখন সেই টাকা দিচ্ছে না। আগের ইউএনও বলেছিলেন, টাকা তুলে দেবেন। কিন্তু সেই যে কথা, আর টাকা পাচ্ছি না। টাকাটা পেলে কিডনি অপারেশন করাতাম।’
আমিনার দাবি, ‘শক্তি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি’তে প্রায় ১০ বছর ধরে টাকা রেখেছিলেন তিনি; আর সমিতির ব্যবস্থাপক ফাতেমা খাতুন সেই সঞ্চয় নিয়ে আত্মগোপন করেছেন।
আমিনা জানান, প্রথম দিকে দুই-পাঁচ টাকা করে জমা দিলেও পরের দিকে সপ্তাহে এক হাজার টাকা হারে রাখতেন তিনি। ২০২২ সালের জুন নাগাদ তাঁর হিসাবে জমার পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৬৬ হাজার টাকা।
একই সমিতিতে টাকা রেখে ঠকেছেন খোকসার মানিককাট গ্রামের মরিয়ম খাতুনও। তাঁর কথায়, ‘আমি এই সমিতিতে যোগ দিয়েছিলাম ২০০৪ সালে। আমরা সবাই গরিব মানুষ। প্রথম দিকে সপ্তাহে দুই টাকা করে সঞ্চয় করতাম। পরে পাঁচ টাকা, এরপর ১০ টাকা করে জমিয়েছি। ২০২২ সাল পর্যন্ত আমার এক লাখ টাকা জমেছিল। আশা ছিল, মেয়ের বিয়ের সময় টাকাগুলো খরচ করব। কিন্তু তার আগেই ফাতেমা টাকা নিয়ে পালিয়েছেন। আমি এর বিচার চাই।’
ক্ষতিগ্রস্ত কেবল এ দুজনই নন। খোকসা উপজেলার এই সমিতির নারী সদস্যদের—সংখ্যায় যাঁরা অন্তত চার শতাধিক—জমানো প্রায় ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকাসহ উধাও হয়েছেন ব্যবস্থাপক ফাতেমা খাতুন, যাঁর স্বামী ওই এলাকার মাহফুজুর রহমান। সদস্যদের আরও অভিযোগ, স্বামী মাহফুজুর রহমানও সমিতির টাকাসহ ফাতেমার সঙ্গে গা ঢাকা দিয়েছেন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে জমানো টাকা ফেরতের দাবিতে খোকসায় উপজেলা পরিষদের মূল ফটকের সামনে মানববন্ধনে দাঁড়ান কয়েক শ ভুক্তভোগী নারী। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খালিদ বিন মনসুরের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন তাঁরা।
ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, সংসারের খরচ থেকে বাঁচিয়ে কেউ ভিক্ষার টাকা, কেউ হাঁস-মুরগির ডিম কিংবা চাল বেচে দুই, পাঁচ, ১০ টাকা হিসেবে সমিতিতে রাখতেন। বছরের পর বছর এভাবে জমিয়ে অনেকে একটা সঞ্চয় দাঁড় করিয়েছিলেন। ভবিষ্যতে বিপদ-আপদ বা সংসারের দরকারে কাজে লাগবে—এই ভাবনা থেকেই টাকা রাখা। কারও পরিকল্পনা ছিল মেয়ের বিয়ের খরচ মেটানো, কারও বা ঘরের আসবাব কেনা। সেই সঞ্চয় খুইয়ে এখন দিশেহারা তাঁরা।
জানা যায়, পাইকপাড়া মির্জাপুর এলাকার নারীরা মিলে ২০০৪ সালে গড়ে তুলেছিলেন ‘শক্তি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি’। সংসারের খরচ সামলে সদস্যরা সপ্তাহে দুই টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত জমা দিতেন। সমিতির হিসাব রাখা আর পরিচালনার ভার ছিল স্থানীয় মাহফুজুর রহমানের স্ত্রী ফাতেমা খাতুনের ওপর।
সদস্যরা অভিযোগ করেন, তাঁদের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে সমিতির জমা প্রায় ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকাসহ ২০২২ সালের ২৫ জুন গা ঢাকা দেন ফাতেমা।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর একটি বৈঠক বসে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, ওই বৈঠকে ফাতেমা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছিলেন যে ছয় মাসের মধ্যে টাকা শোধ করে দেবেন। কিন্তু সেই সময়সীমা পার হয়ে গেলেও টাকা না মেলায় আবারও মানববন্ধনে নামেন তাঁরা, স্মারকলিপি দেন ইউএনওর কাছে। জমানো টাকা দ্রুত ফেরত দেওয়া এবং অভিযুক্ত ফাতেমার সাজার দাবি জানান তাঁরা।
ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যদের একজন মিনা খাতুন বলেন, ‘হাঁস-মুরগির ডিম ও চাল বিক্রি করে দুই, পাঁচ টাকা করে জমিয়েছিলাম। প্রায় ২২ হাজার টাকা জমা হয়েছিল। কিন্তু ফাতেমা সব টাকা নিয়ে পালিয়েছেন। আমরা তাঁর বিচার চাই, টাকা ফেরত চাই।’
সমিতির সভানেত্রী তসলিমা সুলতানার বক্তব্য, ‘ফাতেমা শিক্ষক। তাঁকে সরল বিশ্বাসে ব্যবস্থাপক করে তাঁর কাছে টাকা জমা রাখতাম। কিন্তু তিনি প্রতারণা করে চার শতাধিক সদস্যের গচ্ছিত প্রায় ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়েছেন। সঠিক বিচারের দাবিতে মানববন্ধন শেষে ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি।’
স্মারকলিপি হাতে পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ বিন মনসুর। তিনি বলেন, ‘আগেও কথা দিয়েও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেননি ফাতেমা। এবার আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’