
সশস্ত্র বাহিনীতে প্রয়োজন মেধাবী তরুণ প্রজন্ম
ছবিঃ সংগৃহীত
একবার সৈনিক, চিরকাল সৈনিক: শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও বাংলাদেশের সেবায় এক জীবন
১৯৮২ সালের ৫ নভেম্বর আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করি। প্রতিবছর এই দিনটি আমাকে শুধু আমার সামরিক জীবনের সূচনার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না, বরং মনে করিয়ে দেয় সেই মানুষগুলোকে, তাঁদের মূল্যবোধ ও আত্মত্যাগকে, যাঁরা আমাকে গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছেন। সবার আগে স্মরণ করি আমার মা-বাবাকে, বিশেষ করে আমার মাকে। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল, আমাকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে দেখা।
১৯৮০ সালের নভেম্বরে আমি চার দিনব্যাপী ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ডের (আইএসএসবি) মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশ নিই। সে সময় আমার গুরুতর অসুস্থ মা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। পরীক্ষা শেষে ফিরে এসে আমার নির্বাচিত হওয়ার খবর শুনে মা অত্যন্ত আনন্দিত হন। তিনি বারবার আমাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমার কমিশন লাভের আগেই ১৯৮০ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর পাঁচ ছেলে পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর চার নাতিও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত। এভাবেই তাঁর একটি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পরিণত হয়েছে দেশের সেবায় নিয়োজিত একটি পারিবারিক ঐতিহ্যে।
১৯৮১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আমি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে (বিএমএ) সপ্তম বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি লং কোর্সের একজন ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিই। একাডেমিতে যোগ দেওয়ার অল্প কিছুদিন আগে মাকে হারানোর বেদনা নিয়ে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার প্রথম দিনগুলো আমার জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন। সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল কঠোর, আর নতুন জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চাপও ছিল অনেক। তবে কোর্সের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহপাঠীর আন্তরিক বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ববোধ আমাকে সেই কঠিন সময় অতিক্রম করতে সাহায্য করে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁদের আন্তরিকতা ও সহযোগিতার স্মৃতি আজও আমার কাছে অমলিন।
পূর্ববর্তী কোর্সের কয়েকজনসহ মোট ৮০ জন ক্যাডেট শেষ পর্যন্ত কর্মকর্তা হিসেবে কমিশন লাভ করেন। ১৯৮২ সালের ৪ নভেম্বর আমাদের পাসিং-আউট প্যারেড অনুষ্ঠিত হয় এবং পরদিন আমরা কমিশন লাভ করি। পেছন ফিরে তাকালে উপলব্ধি করি, বিএমএ আমাদের শুধু সামরিক দায়িত্ব পালনের জন্যই প্রস্তুত করেনি; বরং আমাদের চরিত্র, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত এসব গুণ একজন মানুষের সারা জীবনের মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকে।
আমাদের টার্ম কমান্ডার, প্লাটুন কমান্ডার ও অন্যান্য প্রশিক্ষকেরা একটি শিক্ষা বারবার আমাদের মনে গেঁথে দিতেন। সেই কথাটি আজও আমার জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে পথনির্দেশনা দেয়: “You are what you are in the dark”—অর্থাৎ, কেউ যখন দেখছে না, তখনও তুমি প্রকৃতপক্ষে যেমন, তুমি তা-ই।
কথাটির তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেখছেন বলে ভালো কাজ করাই একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্রের পরিচয় নয়। কেউ তদারকি না করলেও সততা, আন্তরিকতা, শৃঙ্খলা ও পেশাগত দায়িত্ববোধ একই রকম অটুট থাকতে হবে। একজন প্রশিক্ষিত সামরিক কর্মকর্তাকে তদারকির মধ্যে থাকুন বা না থাকুন, সমান নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রশিক্ষণের প্রকৃত সার্থকতা এখানেই—কেউ দেখছে না, এমন অবস্থাতেও আমরা নিজেদের মান ও আদর্শ ধরে রাখতে পারছি কি না। এটি শুধু সামরিক জীবনের শিক্ষা নয়; দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব ও নেতৃত্বেরও একটি মৌলিক নীতি।
বিএমএর মূলমন্ত্র “চির উন্নত মম শির”—“Ever High Is My Head”। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার চেতনা থেকে অনুপ্রাণিত এই মূলমন্ত্র সাহস, মর্যাদা এবং প্রতিকূলতার মুখেও মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দৃঢ় সংকল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। সামরিক ও একাডেমিক শিক্ষা, শারীরিক প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের অনুশীলন এবং নেতৃত্ব বিকাশের সমন্বিত ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ সামরিক কর্মকর্তাদের প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিএমএর প্রশিক্ষণ ক্যাডেটদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নেতৃত্ব দেওয়া, দলগতভাবে কাজ করা, দায়িত্ব গ্রহণ, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং চাপের মধ্যেও অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়। এটি শুধু সামরিক কর্মকর্তা তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়; ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
আমার প্রথম কর্মস্থল ছিল চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের গুইমারায় ৬ ইস্ট বেঙ্গল। একটি এসএমজি ও জীবন্ত গোলাবারুদ হাতে নিয়েই শুরু হয়েছিল আমার সামরিক জীবন। পদাতিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সেই মুহূর্ত আজও স্মরণীয়। পরবর্তী বছরগুলোতে আমি বিভিন্ন অপারেশনাল, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা, স্টাফ ও কমান্ড-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেছি। চারটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন এবং তিনটি বাংলাদেশ রাইফেলস ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নামে পরিচিত। এ ছাড়া ২৪তম বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাই এবং এর প্রথম কমান্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি।
আমার সামরিক জীবনে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধ্যায়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে বিভিন্ন অপারেশনাল দায়িত্বে সাড়ে ছয় বছরেরও বেশি সময় কাটিয়েছি। এর মধ্যে ছিল ক্যাম্প ও সাব-জোন কমান্ড, গোয়েন্দা দায়িত্ব এবং রুমা ও জামিনীপাড়া জোনের কমান্ডারের দায়িত্ব। মিজোরাম সীমান্তের দুর্গম এলাকায় সীমান্ত চিহ্নিতকরণ-সংক্রান্ত দায়িত্বও পালন করতে হয়েছে। এসব দায়িত্ব আমাকে শিখিয়েছে, সামরিক নেতৃত্ব শুধু কমান্ড করার ক্ষমতার বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিচক্ষণতা, ধৈর্য, সাহস, সহমর্মিতা এবং যাঁদের মধ্যে আমরা দায়িত্ব পালন করি, তাঁদের সম্পর্কে যথাযথ উপলব্ধি। একজন ভালো কর্মকর্তার নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা থাকতে হবে; তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কীভাবে মানুষের সেবা করতে হয়, তা জানা।
সেনাসদরেও একাধিকবার দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছে, বিশেষ করে সামরিক প্রশিক্ষণ পরিদপ্তরে। পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছি। স্কুল অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সে ইনস্ট্রাক্টর ক্লাস-এ হিসেবেও কাজ করেছি। পেশাগত জীবনে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে মোজাম্বিক ও লাইবেরিয়ায় কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সেখানে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি টিম লিডার এবং ডেপুটি সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্বও পালন করেছি। বিদেশে প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছি। ২০০২ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে সরকারি দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন ছিল তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। এসব অভিজ্ঞতা নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব সম্পর্কে আমার উপলব্ধিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
২০০৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আমি অবসর গ্রহণ করি। তবে অবসর গ্রহণের অর্থ আমার কাছে কখনোই সেবার অঙ্গীকারের অবসান ছিল না। অবসরের পর থেকে আমি ভাষাশিক্ষা ও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করছি। আমার প্রতিষ্ঠিত ভাষা একাডেমির মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে চীনা ভাষা শেখার সুযোগ করে দিতে পেরেছি। পাশাপাশি কয়েক শ শিক্ষার্থী ইংরেজি ও বাংলা ভাষা শিখেছেন। ব্যক্তিগত অর্জন তুলে ধরার জন্য নয়, একটি বিষয় বোঝানোর জন্যই এসব কথা বলছি—সামরিক জীবনে অর্জিত মূল্যবোধ ও গুণাবলি পোশাক ছেড়ে দেওয়ার বহু বছর পরও সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানো সম্ভব।
একবার সৈনিক, চিরকাল সৈনিক। আমার কাছে এর অর্থ হলো, অবসরের মধ্য দিয়ে কোনো পদ বা দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটতে পারে, কিন্তু সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও দেশের সেবার অঙ্গীকারের সমাপ্তি হওয়া উচিত নয়। গায়ে আর ইউনিফর্ম না থাকলেও এর প্রতিনিধিত্বকারী মূল্যবোধগুলো দৈনন্দিন আচরণে জীবন্ত রাখতে হবে। সামরিক প্রশিক্ষণের প্রকৃত পরীক্ষা শুধু ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় একজন কর্মকর্তা কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তা নয়; বরং ইউনিফর্ম খুলে রাখার পর তাঁর জীবনাচরণ কেমন, সেটিও। সামরিক প্রশিক্ষণের লক্ষ্য শুধু দক্ষ কর্মকর্তা তৈরি করা নয়; এমন দায়িত্বশীল মানুষ গড়ে তোলা, যাঁরা সারা জীবন সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবেন।
আমার সামরিক জীবনে একটি চিন্তা ব্যক্তিগত প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে: “অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কেনা যায় না, এমন কিছু পুরস্কারও রয়েছে।” সামরিক জীবনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ, ত্যাগ ও কঠিন বাস্তবতা। শুধু বেতন, মর্যাদা কিংবা সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করে এই পেশা বেছে নেওয়া উচিত নয়। এর গভীরতর প্রাপ্তি হলো মাতৃভূমির সেবা করার গৌরব, কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে অর্জিত আত্মবিশ্বাস, আজীবনের বন্ধুত্ব ও সহমর্মিতার বন্ধন, নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ এবং নিজের চেয়ে বৃহত্তর কোনো লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখার তৃপ্তি। সেনাজীবনে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। এটি এমন কিছু গুণাবলি গড়ে তোলে, যা সারা জীবন কাজে লাগে। এসবই এমন প্রাপ্তি, যা শুধু অর্থ দিয়ে কেনা সম্ভব নয়।
আজ বাংলাদেশের আরও বেশি মেধাবী ও যোগ্য তরুণ-তরুণীর সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা কেন বিবেচনা করা উচিত? বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে চলেছে এবং দেশটির সামনে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে, বঙ্গোপসাগরের তীরে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি, সামুদ্রিক স্বার্থ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন শক্তিশালী, আধুনিক ও পেশাগতভাবে দক্ষ সশস্ত্র বাহিনী। শুধু অস্ত্র ও সরঞ্জাম দিয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষিত, শারীরিকভাবে সক্ষম, নৈতিক মূল্যবোধে দৃঢ় এবং পেশাগতভাবে দক্ষ জনবল, যাঁরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারবেন।
বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এমন যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন, যাঁরা সামরিক প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বিমান চলাচল, প্রকৌশল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আধুনিক যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী—প্রতিটি বাহিনীই ভিন্ন ভিন্ন মেধা, দক্ষতা ও পেশাগত আগ্রহের তরুণদের জন্য সমান মর্যাদাপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে। এসব বাহিনীর দায়িত্ব শুধু প্রচলিত প্রতিরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দুর্যোগ মোকাবিলা, মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা এবং প্রয়োজনের সময় জাতীয় উন্নয়নেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আমি তাই বাংলাদেশের মেধাবী ও যোগ্য তরুণ-তরুণীদের সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মজীবন গড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানাই। তবে তাঁদের বুঝতে হবে, সামরিক জীবন মানে শৃঙ্খলা, শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তা, সততা, সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং বাংলাদেশের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে কর্তব্যকে এবং ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। আমাদের শুধু ইউনিফর্ম পরা মানুষের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না; প্রয়োজন ইউনিফর্ম পরা আরও যোগ্য মানুষ—যাঁরা শিক্ষিত, সৎ, সাহসী, সহমর্মী, প্রযুক্তি-সচেতন এবং নিজেদের কাজের মাধ্যমে নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম। মানসম্মত পেশাগত প্রশিক্ষণ, সমান সুযোগ, মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষের মাধ্যমে দেশকে এ ধরনের মেধাবী তরুণদের আকৃষ্ট ও গড়ে তুলতে হবে।
আমার জীবনের পথচলায় যাঁরা অবদান রেখেছেন, সেই মা-বাবা, বিএমএর টার্ম কমান্ডার, প্লাটুন কমান্ডার, প্রশিক্ষক, ঊর্ধ্বতন কমান্ডার, সহকর্মী ও কোর্সমেটদের প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। শেখা, দায়িত্ব পালন ও নিজেকে গড়ে তোলার অসংখ্য সুযোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ।
কমিশন লাভের বার্ষিকীতে নতুন প্রজন্মের প্রতি আমার বার্তা খুবই সহজ: এমন একটি জীবন বেছে নিন, যা আপনাকে জীবনের লক্ষ্য দেবে, আপনার চরিত্র গড়ে তুলবে এবং দেশের জন্য অর্থবহ অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করবে। আপনার যদি যোগ্যতা, সাহস ও অঙ্গীকার থাকে, তাহলে গর্বের সঙ্গে সামরিক পোশাক পরার কথা বিবেচনা করুন। সামরিক সেবা এক বিশেষ সম্মান, আজীবনের দায়িত্ব এবং এমন এক গৌরবের উৎস, যার মূল্য অর্থ কিংবা বস্তুগত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।
পরিশেষে বলতে চাই, সামরিক প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় অবদান শুধু এমন কর্মকর্তা তৈরি করা নয়, যাঁরা সৈন্যদের নেতৃত্ব দিতে পারেন; বরং এমন মানুষ গড়ে তোলা, যাঁরা শৃঙ্খলা, সততা, সাহস, দায়িত্ববোধ ও সেবার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করেন। এসব গুণ শুধু সশস্ত্র বাহিনীর জন্য নয়, আমাদের সমগ্র সমাজের জন্যই অপরিহার্য।
একবার সৈনিক, চিরকাল সৈনিক। একবার বাংলাদেশের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হলে, দেশের মানুষ, সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যতের প্রতিও সেই অঙ্গীকার আজীবন অটুট থাকবে।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘজীবী হোক। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
লে. কর্নেল মো. শাহাদাত হোসেন, পিএসসি (অব.)অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর, ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ,
বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি
সাবেক পদাতিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
ইমেইল: shahadatb@gmail.com
