অন্তরকে মসজিদমুখী করে তুলবেন যেভাবে
ছবিঃ সংগৃহীত
আল্লাহ তাআলার ঘর হলো মসজিদ। তাঁর জিকির ও ইবাদত, তাঁর বড়ত্ব ও মহিমার বর্ণনা এবং তাঁর তাওহিদ ও রুবুবিয়াতের আলোচনা এখানে হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেসব গৃহে, যাকে মর্যাদা দিতে এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ আদেশ করেছেন। তাতে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর তাসবিহ করে সেসব লোক, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা আল্লাহর স্মরণ থেকে এবং নামাজ কায়েম ও জাকাত আদায় থেকে গাফেল করে না…।’ (সুরা: নুর, আয়াত: ৩৬)
প্রতিটি গ্রামে মসজিদ গড়ে উঠুক, সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সেগুলো পরিচালিত হোক, মুসল্লি ও জিকিরকারীতে ভরে উঠুক এবং মসজিদের মাধ্যমে হেদায়েতের আলো সবখানে ছড়িয়ে পড়ুক—এমন প্রত্যাশা রাখাই মসজিদের সার্বিক কল্যাণ কামনার অর্থ। এটি কেবল মসজিদের সঙ্গে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নয়, ঈমানেরও অংশ। অন্যদিকে মসজিদের কোনো রকম অকল্যাণ কামনা করা মসজিদের প্রতি চরম বেয়াদবি এবং কুফরের পরিচায়ক।
মসজিদ ও সালাতের প্রতি মুমিনের অন্তরে থাকে এক গভীর টান বা আত্মিক আকর্ষণ। এই অনুভূতিতে যাঁদের হৃদয় সব সময় সিক্ত থাকে, মূলত তাঁরাই মসজিদমুখী বান্দা। মসজিদমুখী হওয়া মানে শুধু সশরীরে মসজিদে হাজির হওয়া নয়; বরং মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসার পর পরবর্তী ওয়াক্তের আজানের জন্য মনের ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা ও ব্যাকুলতা অনুভব করা। কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া লাভ করবে, তন্মধ্যে অন্যতম সেই ব্যক্তি, যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে ঝুলন্ত থাকে। (বুখারি, হাদিস: ৬৬০)
অন্তর মসজিদমুখী করার উপায়
মসজিদই মুমিনের হৃদয়ের প্রশান্তি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির কেন্দ্রবিন্দু। একজন মুমিন সদিচ্ছা আর কিছু কার্যকর অভ্যাসের মাধ্যমেই নিজের অন্তরকে মসজিদমুখী করে তুলতে পারেন। এর কয়েকটি উপায় নিচে উল্লেখ করা হলো—
মসজিদের ফজিলত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা
লাভের পেছনে ছোটা মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। কোনো কাজের উপকারিতা কিংবা পুরস্কারের কথা জানা থাকলে সে কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। তাই মসজিদমুখী জীবন গড়তে হলে সবার আগে মসজিদের ফজিলত ও মর্যাদা উপলব্ধি করা দরকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হলো মসজিদ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা হলো বাজার।’ (মুসলিম, হাদিস: ৬৭১)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘মসজিদগুলো জমিনে আল্লাহর ঘর। এগুলো আসমানবাসীদের জন্য তেমনি উজ্জ্বল দেখায়, যেমন আসমানের নক্ষত্ররাজি জমিনবাসীদের জন্য উজ্জ্বল দেখায়।’ (তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস: ১০৬০৮)
জামাতে সালাত আদায়ের পুরস্কার নিয়ে চিন্তা করা
জামাতে সালাত আদায়ের নেকির কথা চিন্তা-ভাবনা করলে মসজিদে যাওয়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। কারণ জামাতে সালাত আদায় করলে একাকী সালাত আদায়ের তুলনায় ২৭ গুণ বেশি সওয়াব মেলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জামাতে সালাত আদায় করা একাকী সালাত আদায়ের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি মর্যাদাপূর্ণ।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৪৫)
মসজিদের কার্যক্রম ও সেবায় অংশগ্রহণ
মসজিদ কেবল সালাতের জায়গা নয়; এটি একই সঙ্গে জ্ঞান অর্জন ও মুসলমানদের সামাজিক কেন্দ্র। মসজিদের শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়, মসজিদের প্রতি ভালোবাসাও তৈরি হয়। মসজিদে দ্বিনি আলোচনা বা দরসে উপস্থিত হলে পরিপূর্ণ হজের সওয়াব পাওয়া যায়। আবু উমামা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কল্যাণময় (দ্বিনি) জ্ঞান অর্জন অথবা ওই জ্ঞান বিতরণের জন্যই শুধু মসজিদে গমনাগমন করে, তার জন্য পরিপূর্ণ হজের নেকি আছে।’ (তাবারানি, মুজামুল কাবির, হাদিস: ৭৪৭৩)
মসজিদকে শয়তানের আক্রমণ থেকে বাঁচার দুর্গ মনে করা
একাকী সালাত আদায়ের অর্থই হলো শয়তানের সহজ শিকার হয়ে পড়া। অন্যদিকে মসজিদে জামাতে সালাত আদায় করলে মুমিন বান্দা একটি সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় লাভ করে, যে দুর্গ তাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো জনপদে বা বনজঙ্গলে তিনজন লোক একত্রে বসবাস করা সত্ত্বেও যদি তারা জামাতে সালাত আদায় না করে, তবে তাদের ওপর শয়তান আধিপত্য বিস্তার করে। অতএব, তোমরা জামাতকে আঁকড়ে ধরো। কারণ নেকড়ে (বাঘ) দলচ্যুত বকরিকেই খেয়ে থাকে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৫৪৭)
মসজিদমুখী ভালো সঙ্গী নির্বাচন করা
মসজিদমুখী একজন বন্ধু মসজিদমুখী হওয়ার পথে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। বন্ধুর দ্বারা প্রভাবিত হওয়া মানুষের স্বভাব। বন্ধু দ্বিনদার হলে প্রতিটি আলাপনই হবে জান্নাত ও রবের সন্তুষ্টি নিয়ে। দ্বিনদার মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি নিজেকে ধরে রাখো তাদের সঙ্গে যারা সকালে ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর চেহারা কামনায় আহবান করে।’ (সুরা: কাহফ, আয়াত: ২৮)
পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের নির্ধারিত স্থান ও মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হলো মসজিদ। মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অর্থ স্বয়ং আল্লাহর সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে তোলা। মহান আল্লাহ আমাদের মসজিদমুখী বান্দা হিসেবে কবুল করুন।