ছবিঃ সংগৃহীত
২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচটিই ছিল লিওনেল মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ; এর মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর দুই দশকের রাজকীয় পথচলার শেষ অধ্যায়ও লেখা হয়ে গেল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০৫ সালে অভিষেকের পর তিনি গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড, দলকে জিতিয়েছেন অধরা সব ট্রফি। শেষ ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পরিসংখ্যান পৌঁছেছে অনন্য উচ্চতায়।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির অভিষেক ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, হাঙ্গেরির বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে। তার পর থেকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৮ ম্যাচে তাঁর গোল ১২৬টি; সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন আরও ৬৯টি। ১১টি হ্যাটট্রিক আছে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে। এই সময়ে তিনি হলুদ কার্ড দেখেছেন ৯টি, লাল কার্ড দুটি।
জাতীয় দলের হয়ে তিনি মাঠে ছিলেন সব মিলিয়ে ১৭ হাজার ২১০ মিনিট। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি জিতেছেন চারটি ট্রফি—২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ এবং সে বছরেরই ফিনালিসিমা। জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা-খরা ঘুচিয়েছেন দীর্ঘ অপেক্ষার পর, আর হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়ক।
প্রতিপক্ষের বিচারেও নানা বৈচিত্র্য দেখা যায় মেসির রেকর্ডে। ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও চিলি—প্রত্যেকের বিপক্ষে তিনি খেলেছেন সর্বোচ্চ ১৪টি করে ম্যাচ। তাঁর সর্বোচ্চ ১১ গোল বলিভিয়ার বিপক্ষে। সাতটি করে গোল করেছেন ইকুয়েডর ও ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে।
এক ম্যাচে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির সর্বোচ্চ গোলসংখ্যা পাঁচ। এস্তোনিয়ার বিপক্ষে ২০২২ সালের এক প্রীতি ম্যাচে তিনি একাই জালে বল পাঠান পাঁচবার। সে বছরই এই মহাতারকা গড়েন আরেক কীর্তি—এক পঞ্জিকাবর্ষে জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ ১৮ গোল। সব মিলিয়ে ৪৬টি দেশের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে গোল আছে মেসির।
কোন প্রতিযোগিতায় কত গোল
প্রীতি ম্যাচ ও বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব থেকেই এসেছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির গোলের বড় অংশ। ৬২টি প্রীতি ম্যাচে তিনি গোল করেছেন ৫৫টি, আর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ৭২ ম্যাচে ৩৬টি। বিশ্বকাপে তাঁর গোল ৩৪ ম্যাচে ২১টি, কোপা আমেরিকায় ৩৯ ম্যাচে ১৪টি। ফিনালিসিমায় খেলেছেন এক ম্যাচ, তাতে গোলের দেখা পাননি।
বিশ্বকাপে মেসির একের পর এক রেকর্ড
বিশ্বকাপের আসরেও মেসির রেকর্ডের ছড়াছড়ি। দুটি বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল জয়ী একমাত্র ফুটবলার তিনিই। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬ বার ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতার রেকর্ডও তাঁর।
ছয়টি করে বিশ্বকাপে খেলেছেন মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দুজনই। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৩৪ ম্যাচ খেলার রেকর্ড মেসির। জয়ের সংখ্যাতেও সবার ওপরে লিওনেল মেসি; বিশ্বকাপে তিনি জিতেছেন ২৩টি ম্যাচ।
তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম একাদশে জায়গা পাওয়া একমাত্র খেলোয়াড়ও মেসি। ফ্রান্সের বিপক্ষে ২০২২ সালের ফাইনালে যখন মাঠে নামেন, তখন তাঁর বয়স ৩৫ বছর। আরও একটি অনন্য রেকর্ড যোগ হয়েছে তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে—সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা খেলোয়াড়দের তালিকায়ও তিনি শীর্ষে, বয়স তখন ৩৯ বছর ২৫ দিন।
বিশ্বকাপ এবং মহাদেশীয় টুর্নামেন্টে মেসির সম্মিলিত গোলসংখ্যা ৩৫। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় ২১ গোল নিয়ে তাঁর অবস্থান দ্বিতীয়। ২২ গোল করে তাঁর ওপরে রয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে।
সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের হিসাবেও দ্বিতীয় স্থানে মেসি। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ঠিক পরেই তাঁর অবস্থান—২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল। আর রোনালদোর গোল ১৪৬টি, ২৩৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ক্যারিয়ার নিছক গোল, ম্যাচ কিংবা ট্রফির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; এ এক যুগের গল্প। কোপা আমেরিকা হোক বা বিশ্বকাপ, দলীয় সাফল্য হোক বা ব্যক্তিগত রেকর্ড—প্রায় দুই দশক জাতীয় দলের হয়ে খেলে লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে স্থায়ী করে গেলেন নিজের নাম।