এলপিজির সরবরাহ নিয়ে কারসাজি বা ধর্মঘট করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে সরকার
ছবিঃ সংগৃহীত
কৃত্রিম সংকট তৈরি, বাজারে কারসাজি কিংবা ধর্মঘট ডেকে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) নিয়ে জনগণকে জিম্মি করার যেকোনো চেষ্টা সরকার কঠোর হাতে দমন করবে বলে সতর্ক করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
মন্ত্রীর ভাষ্য, এলপিজি একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য; এর সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে জনস্বার্থবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি করলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অবস্থান তুলে ধরেন।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাত এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে—এ কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে নানা দেশে জ্বালানির সরবরাহ ও দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম স্থিতিশীল নেই। এমন বাস্তবতায় দেশের বাজারে এলপিজির সরবরাহ ও দাম সহনীয় রাখতে সরকার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে।
এলপিজি সরবরাহে বেসরকারি খাত সরাসরি যুক্ত থাকায় বাজারের বিদ্যমান সমস্যা মেটাতে সরকার অপারেটরদের সঙ্গে বসেছে বলে জানান তিনি। ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো কীভাবে সমন্বয় করা যায় এবং বাজার কীভাবে স্বাভাবিক রাখা যায়—বৈঠকে এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ আরও জানান, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাতে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, তা মাথায় রেখে এলপিজির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি সরকার পর্যালোচনা করছে। বাজারে দাম যাতে স্থিতিশীল থাকে এবং ব্যবসায়ীরা যাতে অযৌক্তিক সমস্যায় না পড়েন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অপারেটরদের সঙ্গে এ বিষয়ে এটি তৃতীয় বৈঠক বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। আগের বৈঠকগুলোতেও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছিল; ব্যবসায়ীদের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উপায় খোঁজা চলছে। আগামী ২০ অক্টোবর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ফের আলোচনায় বসা হবে, যার মধ্য দিয়ে বাজার স্বাভাবিক রাখা ও সরবরাহব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ধর্মঘট প্রত্যাহার নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, এলপিজি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকার বৈঠক করেছে এবং নিজেদের অবস্থান তাদের জানিয়ে দিয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় এর সরবরাহ নিয়ে কোনো কারসাজি, জনগণকে জিম্মি করা কিংবা ধর্মঘটের মতো কর্মসূচিতে জনদুর্ভোগ তৈরি করা হলে সরকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
একই সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, দেশে এলপিজি সরবরাহ ও বিপণনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত ফর্মুলা মেনে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার প্রতি মাসে এলপিজির দাম ঠিক করে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নানা দাবিদাওয়া তুলে ধরে এলপিজির ডিলার ও বিক্রেতারা চলতি সপ্তাহের শেষ দুই দিন ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে অপারেটরদের সঙ্গে বসে চলতি ও আগামী বছরের এলপিজি সরবরাহ কীভাবে স্থিতিশীল রাখা যায়, সে কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে; তবে সেই কৌশল প্রকাশের সময় এখনো আসেনি।
ডিলার পর্যায়ের ধর্মঘটের হুমকি প্রসঙ্গে সতর্ক করে তিনি বলেন, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সরবরাহ ও ব্যবসার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন আছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন, ১৯৫৬ অনুযায়ী এ ধরনের পণ্যের সরবরাহ নিয়ে কারসাজির চেষ্টা, বাজারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে জনস্বার্থবিরোধী পরিস্থিতি সৃষ্টি কিংবা হুমকি দিয়ে জনগণকে দুর্ভোগে ফেলার চেষ্টা হলে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
দেশের লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এলপিজির সঙ্গে জড়িত—রান্নাসহ নানা জরুরি কাজে এ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়—এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সাধারণ মানুষই সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বে, আর এমন পরিস্থিতি সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক সমস্যা সমাধানে সরকার প্রস্তুত জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো দাবি বা সমস্যা থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরতে হবে। আলোচনায় মেটানো যায় এমন বাণিজ্যিক বিরোধের জেরে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া বা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা গ্রহণযোগ্য নয়; নিজের স্বার্থে কেউ বাজার পরিস্থিতিকে ব্যবহার করতে চাইলে সরকার তা বরদাশত করবে না।
এলপিজির বাজার স্বাভাবিক ও সরবরাহ অব্যাহত রাখতে অপারেটর ও ডিলারদের সঙ্গে সরকার আলোচনা চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি। তবে আলোচনার সুযোগ নিয়ে কেউ জনস্বার্থবিরোধী কর্মসূচি নিলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকে এলপিজির দাম, সরবরাহ, ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব—এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক সমস্যার সমাধান এবং একই সঙ্গে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করাই সরকারের লক্ষ্য।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, সরকারি পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য ধর্মঘটে বাজারে যাতে সংকট না বাধে, সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।