জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বাড়াচ্ছে মার্কিন শোধনাগার, এক্সনমোবিল-শেভরনের মুনাফা দ্বিগুণের বেশি
ছবিঃ সংগৃহীত
রাশিয়া ও ইরানকে ঘিরে চলা সংঘাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে টান পড়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যমান শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কিছু শোধনাগার আবার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো।
উদ্দেশ্য একটাই—একই পরিমাণ অপরিশোধিত তেল থেকে আরও বেশি জ্বালানি বের করা।
বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তেল কোম্পানি এক্সনমোবিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড্যারেন উডস গতকাল শুক্রবার জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে তাঁদের শোধনাগারগুলো জ্বালানি উৎপাদনে রেকর্ড সক্ষমতায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেলের ১০০ শতাংশ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে রয়েছে। ডিজেলের দামও গ্যালনপ্রতি ৬ ডলারের কাছাকাছি, যা সর্বকালের সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি পর্যায়।
এক বিবৃতিতে উডস বলেন, ‘তৃতীয় প্রান্তিকে আমরা বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’
উডসের ধারণা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিকের কাছাকাছি ফিরতে আগামী বছরের অনেকটা সময় লেগে যেতে পারে, এমনকি আরও বেশি সময়ও লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেক বড় তেল কোম্পানি শেভরন জানিয়েছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে তাদের শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতের পরিমাণ রেকর্ড ছুঁয়েছে।
শেভরনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইক ওয়ার্থ বলেন, ‘সরবরাহ সংকটে থাকা বাজারে আরও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা নতুন করে বিনিয়োগ করছি।’
তবে কোম্পানিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্ক নেলসনের তথ্য, বিশ্বজুড়ে মোট তেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ এখনো বন্ধ রয়েছে।
তাঁর মতে, শোধনাগারগুলো আবার পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে এবং রপ্তানি বাড়লে একসময় জ্বালানি পরিশোধনের মুনাফার হার কমে আসবে; তবে সে পর্যায়ে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে।
শুক্রবার প্রকাশিত তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, এক্সনমোবিল ও শেভরন—দুই কোম্পানিরই মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি আর পরিশোধনের মুনাফার হার বাড়ায় বড় আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে তেল কোম্পানিগুলো।
অন্যদিকে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শোধনাগারে উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে ইরানের ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে ইরানের বাধার কারণে বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে গেছে।
ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট তেল পরিশোধন সক্ষমতার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জি গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে, উৎপাদন পরিস্থিতির অবনতি চলতে থাকলে ২০২৭ সালে রাশিয়াকে পেট্রল ও ডিজেল আমদানি করতে হতে পারে। অর্থাৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক থেকে আমদানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশটি।
রাশিয়ার জ্বালানিবিষয়ক উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক সাংবাদিককে জানান, ইউক্রেন আবারও রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা শুরু করেছে। সর্বশেষ হামলায় দেশটির তিনটি তেল শোধনাগার ও একটি গ্যাস-রাসায়নিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুক্রবারের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এক্সনমোবিলের মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৫৪০ কোটি ডলারে, গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৭৫০ কোটি ডলার।
শেভরনের মুনাফা বেড়ে হয়েছে ৯৯০ কোটি ডলার; গত বছরের একই প্রান্তিকে এর পরিমাণ ছিল ৩৫০ কোটি ডলার।
তবে পেট্রল ও ডিজেলের লাগামহীন দাম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে রাজনৈতিক চাপে ফেলেছে। ভোক্তাদের ওপর বাড়তি দামের চাপ কমাতে তেল কোম্পানিগুলোকে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে প্রশাসন।
এমন প্রেক্ষাপটে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যালেরো এনার্জি শুক্রবার জানিয়েছে, লায়নডেলবাসেলের কাছ থেকে হিউস্টনের দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি তেল শোধনাগার ৩২ কোটি ৫ লাখ ডলারে কেনার চুক্তি করেছে তারা। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ শোধনাগারটির প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যক্রম আবার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রেক্ষাপট
ব্লুমবার্গের বরাতে ট্রান্সপোর্ট টপিকস ১ জুন ২০২৬ জানায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যায়; এর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথে পরিবাহিত হতো।
হাইড্রোকার্বন প্রসেসিংয়ের ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লায়নডেলবাসেল তখন দৈনিক ২ লাখ ৬৩ হাজার ৭৭৬ ব্যারেল সক্ষমতার হিউস্টন শোধনাগারটি চূড়ান্তভাবে বন্ধ করেছিল।
সংখ্যার হিসাব
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) ২০ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর দেশটিতে নিয়মিত পেট্রলের খুচরা দাম ছিল গ্যালনপ্রতি ৪.২৮৪ ডলার, যা এক বছর আগের চেয়ে ১.২৬৫ ডলার বেশি; ডিজেলের দাম ছিল ৬.২৭৬ ডলার, এক বছরে বেড়েছে ২.৬৫৬ ডলার।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাসস
প্রেক্ষাপট সূত্র: ট্রান্সপোর্ট টপিকস (ব্লুমবার্গ), ১ জুন ২০২৬; হাইড্রোকার্বন প্রসেসিং, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫; মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ), ২০ অক্টোবর ২০২৬