‘অ্যালায়েন্স ফর দ্য ফিউচার’: যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা কমাতে কানাডা-ইইউর নতুন জোট
ছবিঃ সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বিশ্ব রাজনীতির অনিশ্চয়তা সামাল দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন একটি জোট গড়ার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। জোটের নাম ‘অ্যালায়েন্স ফর দ্য ফিউচার’। একই ধরনের মূল্যবোধে বিশ্বাসী অন্য দেশগুলোকেও এতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কানাডার মন্ট্রিলে দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয় শুক্রবার। এরপর দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন নতুন এ অংশীদারত্বের কথা জানান। দুজনের মতে, কানাডা ও ইইউর ২৭ সদস্যের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর হলে অভূতপূর্ব স্থিতিশীলতা ও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কার্নি বলেন, তাঁদের সমাজ এখন নতুন সংকটের মুখে। এর পেছনে রয়েছে জলবায়ু সংকট, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং বাণিজ্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানোর প্রবণতা। এসব চ্যালেঞ্জ সামলাতে সমমনা দেশগুলোর ঐক্য দরকার বলে মনে করেন তিনি।
সম্মেলনে ইউক্রেনকে সহায়তায় ইইউর ৯ হাজার কোটি ইউরোর ঋণ কর্মসূচিতে অবদান রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কানাডা। ভবিষ্যতে কয়েক হাজার কোটি ডলারের সমন্বিত বাজার গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও ভ্রমণের বাধা কমানো এবং শিক্ষা বিনিময়ের সুযোগ বাড়ানো নিয়েও দুই পক্ষের নেতারা আলোচনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যে নতুন অংশীদার খুঁজছেন কার্নি। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চায় কানাডা। ইউক্রেনে স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড সেবার গতি কমিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশটির উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিকল্প প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ার পদক্ষেপ হিসেবে কার্নি সামনে আনেন কানাডার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান কোহিয়ার ও জার্মানির আলেফ আলফার সম্ভাব্য একীভূতকরণকে। নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় হবে বার্লিন ও টরন্টোতে, আর এতে সর্বোচ্চ ১৬০ কোটি কানাডীয় ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা সরকার। ইউরোপের সুপারকম্পিউটিং নেটওয়ার্কে কানাডার যুক্ত হওয়া নিয়েও দুই পক্ষ চুক্তি করেছে।
কানাডাকে ইইউর ‘সহযোগী সদস্য’ করার সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠেছে। এ ধারণা নিয়ে ইইউর কয়েকটি সদস্যদেশ আপত্তি তুলেছিল। এমন সদস্যপদের কাঠামো ও ক্ষমতা কী হবে, তা ২০২৭ সালের সম্মেলনে চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছেন নেতারা।
ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর মধ্যে কানাডাকে ‘সবচেয়ে বেশি ইউরোপীয়’ বলে বর্ণনা করেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা।
সম্মেলন ঘিরে অবশ্য কানাডার কুইবেক প্রদেশে রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। প্রদেশটির প্রধানমন্ত্রী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী দল পার্টি কেবেকোয়ার নেতা পল সেন্ট-পিয়ের প্লামন্ডন সম্মেলনে যাননি। অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ অটোয়া না দেওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
প্রেক্ষাপট
ইউরোপীয় কমিশনের ২৪ জুন ২০২৫-এর বিবৃতি অনুযায়ী, ২০তম ইইউ-কানাডা সম্মেলনে দুই পক্ষ একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব চুক্তিতে সই করেছিল।
লা ভোচে দি নিউইয়র্কের ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, উরসুলা ফন ডার লায়েন ১৬ সেপ্টেম্বর ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে কানাডাকে ইইউর প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাব দেন; কার্নি প্রস্তাবের লক্ষ্যকে স্বাগত জানালেও তখন কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ধারণাটিকে ‘হাস্যকর’ বলে ইউরোপের ওপর ভারী শুল্কের হুমকি দিয়েছিলেন।
বিএনএন ব্লুমবার্গে প্রকাশিত দ্য কানাডিয়ান প্রেসের ২৪ এপ্রিল ২০২৬-এর খবরে জানা যায়, টরন্টোভিত্তিক কোহিয়ার ও জার্মানির আলেফ আলফা সেদিনই একীভূত হওয়ার ঘোষণা দেয়; নতুন প্রতিষ্ঠান কোহিয়ার নামেই চলবে।
সংখ্যার হিসাব
ইউরোপীয় কমিশনের ২৪ জুন ২০২৫-এর হিসাবে, ২০১৭ সালে সিইটিএ বাণিজ্য চুক্তি অস্থায়ীভাবে কার্যকর হওয়ার পর ইইউ-কানাডা বাণিজ্য ৭১ শতাংশ বেড়েছে।
এক নজরে
বিএনএন ব্লুমবার্গের একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোহিয়ার ও আলেফ আলফা দুটিই ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৪ সালে কোহিয়ারে ২৪ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছিল।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রেক্ষাপট সূত্র: ইউরোপীয় কমিশন, ২৪ জুন ২০২৫; লা ভোচে দি নিউইয়র্ক, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬; বিএনএন ব্লুমবার্গ / দ্য কানাডিয়ান প্রেস, ২৪ এপ্রিল ২০২৬