স্ট্রোকের লক্ষণ দেখলে দেরি নয়: সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসায় বাড়ে বাঁচার সম্ভাবনা
ছবিঃ সংগৃহীত
স্ট্রোক এমন এক জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা, যেখানে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, কমাতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার ঝুঁকিও। অথচ বাস্তবে লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও রোগী বা পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বুঝে উঠতে পারেন না কী করবেন। কেউ লক্ষণ কমে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন, কেউ আবার বাড়িতেই প্রাথমিক চিকিৎসার চেষ্টা করেন। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে এমন দেরি বিপজ্জনক হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল প্রচলিত একটি কথা আছে—‘টাইম ইজ বার্নিং’। মানে, প্রতিটি মুহূর্তের দেরিতে মস্তিষ্কের আরও কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দেওয়ামাত্র রোগীকে উপযুক্ত জরুরি চিকিৎসার সুবিধা আছে এমন হাসপাতালে নিতে হবে।
স্ট্রোক প্রধানত দুই রকম—ইস্কেমিক ও হেমোরেজিক। ইস্কেমিক স্ট্রোকে রক্ত জমাট বা অন্য কোনো কারণে মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হয়ে যায়। হেমোরেজিক স্ট্রোকে রক্তনালি ফেটে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। মস্তিষ্কের কোষ স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্তের ওপর নির্ভর করে; রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হলে কোষগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দুই ধরনের স্ট্রোকের চিকিৎসা আলাদা। তাই জরুরি ভিত্তিতে ব্রেন সিটি স্ক্যান করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে কি না, তা দেখা এবং দ্রুত সঠিক চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
ইস্কেমিক স্ট্রোকে উপযুক্ত রোগীকে শিরাপথে ওষুধ দিয়ে জমাট রক্ত গলিয়ে দেওয়ার চিকিৎসাকে বলা হয় ইন্ট্রাভেনাস থ্রম্বোলাইসিস। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ও আমেরিকান স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের নির্দেশিকায় উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষণ শুরুর প্রথম সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে আল্টেপ্লেস অথবা টেনেক্টেপ্লেস দিয়ে চিকিৎসার সুপারিশ করা হয়েছে। এমন রোগীর ক্ষেত্রে বাড়তি ইমেজিং পরীক্ষার জন্য অকারণে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম সাড়ে ৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেই যে সব পথ বন্ধ, তা নয়। উন্নত ইমেজিং পরীক্ষায় যদি মস্তিষ্কের এমন অংশ শনাক্ত করা যায়, যেখানে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনলে উপকারের সম্ভাবনা আছে, তবে লক্ষণ শুরুর সাড়ে ৪ থেকে ৯ ঘণ্টার মধ্যেও থ্রম্বোলাইসিস বিবেচনা করা যায়। ঘুম থেকে ওঠার পর স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়া কিছু রোগীর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ইমেজিং ও চিকিৎসাগত মানদণ্ড পূরণ হলে এ চিকিৎসার সুযোগ থাকতে পারে। তবে কোন রোগী উপযুক্ত এবং কী চিকিৎসা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
মস্তিষ্কের বড় রক্তনালিতে জমাট রক্ত আটকে গেলে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি পদ্ধতিতে বিশেষ যন্ত্র দিয়ে সেই জমাট সরিয়ে ফেলা যায়। উপযুক্ত রোগীকে সাধারণত লক্ষণ শুরুর প্রথম ৬ ঘণ্টার মধ্যে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত ও ইমেজিং মানদণ্ড পূরণ হলে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ৬ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও থ্রম্বেকটমি করা সম্ভব।
হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হলেও চিকিৎসার সুযোগ আছে কি না, সেটি যাচাই করা জরুরি। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্তক্ষরণ বাড়াতে পারে এমন ওষুধের প্রভাব সামলানো এবং দরকার হলে অস্ত্রোপচারসহ অন্যান্য চিকিৎসা লাগতে পারে।
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান বাদ দেওয়া, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমানো, শাকসবজি-ফলসহ সুষম খাবার খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখা। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ খাওয়া ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোও গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর হাত-পা দুর্বল হয়ে পড়ে, কথা বলতে কষ্ট হয়, কিংবা হাঁটাচলা ও দৈনন্দিন কাজে অন্যের সাহায্য লাগে। এ অবস্থায় শুধু ওষুধ যথেষ্ট নয়; রোগীর অবস্থা ও প্রয়োজন বুঝে পুনর্বাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ফিজিওথেরাপি, কথা বলার অনুশীলন, গিলতে অসুবিধার চিকিৎসা আর দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ফেরানোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রোগী যাতে স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও জীবনযাপন করতে পারেন, সেই চেষ্টা করা হয়। রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল হলে চিকিৎসকের পরামর্শে উপযুক্ত পুনর্বাসন শুরু করা উচিত।
লেখক: কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর, নিউরোলজি বিভাগ, এভারকেয়ার হসপিটাল, চট্টগ্রাম
সংখ্যার হিসাব
প্রথম আলোর ৬ মার্চ ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেশে প্রতি হাজারে ১.০৭ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত পাওয়া যায়; বিভাগগুলোর মধ্যে হার সবচেয়ে বেশি খুলনায় (১.৭৭), সবচেয়ে কম রংপুরে (০.৬২)।
একই প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএসের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৩ সালে সরকারি হাসপাতালে স্ট্রোকে ২০ হাজার ৬৬১ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: প্রথম আলো, ৬ মার্চ ২০২৪