পেনসিলভানিয়ায় হামে আক্রান্ত ১,৩৫০ ছাড়াল, প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র অ্যামিশ-অধ্যুষিত ল্যাঙ্কাস্টার
ছবিঃ সংগৃহীত
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৩৫০ পেরিয়ে গেছে। অঙ্গরাজ্যটির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে এ বছর সবচেয়ে বেশি রোগী পেনসিলভানিয়াতেই।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির বাসিন্দা। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি অ্যামিশ জনগোষ্ঠীর বাস এই কাউন্টিতে। গত ৩৫ বছরে দেশটিতে দেখা দেওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র এখন এলাকাটি।
হাম ও হামের উপসর্গে এর মধ্যে ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টিতে তিনজন এবং অন্য কাউন্টিগুলোতে দুজন মারা গেছেন।
প্রাদুর্ভাব কতটা গুরুতর, তা বোঝাতে একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যাঁরা হামের ঝুঁকিতে আছেন, তাঁদের কারও নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। টিকা নেননি বা আগে কখনো হামে ভোগেননি—এমন কেউই এ ভাইরাস থেকে নিরাপদ নন।
অ্যামিশ জনগোষ্ঠীতে টিকা নেওয়ার হার দীর্ঘদিন ধরেই কম। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এখন টিকা নেওয়ার প্রবণতা কমছে। এতে অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অথচ ২০০০ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে হামমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।
কমিউনিটির নেতাদের ধারণা, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। কারণ, হামে আক্রান্ত অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যান না, ফলে তাঁদের অনেকের তথ্য সরকারি খাতায় ওঠে না।
অ্যামিশ ও রক্ষণশীল মেনোনাইট সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে গঠিত ‘প্লেইন কমিউনিটি’ বা অনাড়ম্বর জীবনযাপনকারী ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এ প্রাদুর্ভাবের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মেনে তাঁরা সাধারণ পোশাক পরেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও সীমিত রাখেন। তাঁদের এই জীবনধারা বোঝাতেই ‘প্লেইন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
তবে এ জনগোষ্ঠীর সবাই টিকা নিয়ে একই মনোভাব পোষণ করেন না, টিকা নেওয়ার হারও সবার ক্ষেত্রে এক নয়। সামগ্রিকভাবে সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় তাঁদের মধ্যে টিকা নেওয়ার প্রবণতা কম। ধর্মীয় বিধিনিষেধের চেয়ে সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের অভ্যাসকেই এর পেছনে বেশি দায়ী মনে করা হয়।
২০২৫ সালেও টেক্সাসসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি এলাকায় মেনোনাইট জনগোষ্ঠীর মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। চলতি বছরও দেশটির বেশির ভাগ অঙ্গরাজ্যে হামের রোগী পাওয়া গেছে।
প্লেইন কমিউনিটির মানুষ সমাজের নানা কর্মকাণ্ডে কম অংশ নিলেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নন। কৃষিপণ্যের বাজার, চিকিৎসকের চেম্বারসহ বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়। ফলে তাঁদের মধ্যে হাম ছড়ালে বৃহত্তর সমাজেও তার প্রভাব পড়তে পারে। আবার প্রাদুর্ভাবের ধাক্কায় তাঁদের মধ্যে টিকা নেওয়ার প্রবণতা বাড়লে সেই ইতিবাচক প্রভাবও ছড়াতে পারে পুরো সমাজে।
অনেকের ধারণা, প্লেইন কমিউনিটির সবাই টিকাবিরোধী। বাস্তবে এ বিষয়ে তাঁদের মনোভাব নানা রকম। কমিউনিটির নেতা ও গবেষকেরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে এ জনগোষ্ঠীর টিকা-ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে—কখনো আগ্রহ বেড়েছে, কখনো কমেছে। সর্বশেষ কোভিড-১৯ মহামারির সময় কড়া জনস্বাস্থ্যবিধি আরোপের প্রতিক্রিয়ায় টিকার প্রতি তাঁদের আগ্রহ কমে যায়।
চলমান প্রাদুর্ভাবের কারণে তাঁদের অনেকে এখন টিকা নিতে আগ্রহী হচ্ছেন। আবার একই পরিস্থিতি অন্যদের মধ্যে টিকা নিয়ে সংশয় ও অবিশ্বাস আরও উসকে দিচ্ছে। তবে কমিউনিটির নেতা ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, যাঁরা টিকা এড়িয়ে চলেন, তাঁদের বেশির ভাগের সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো আদর্শিক অবস্থান কাজ করে না।
প্রেক্ষাপট
পিবিএস নিউজআওয়ারের ১৯ আগস্ট ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেক্সাসের গেইনস কাউন্টির মেনোনাইট সম্প্রদায় থেকে ছড়ানো গত বছরের প্রাদুর্ভাবে ৭৬২ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন; টিকা না নেওয়া দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছিল।
সংখ্যার হিসাব
মেডিকেল ডেইলির ২৬ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিডিসির হিসাবে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে হামে নিশ্চিত আক্রান্ত ৪ হাজার ৫৮৮ জন; সিডিসির জাতীয় তালিকায় মৃত্যুর সংখ্যা তিন। অঙ্গরাজ্যের হিসাবের সঙ্গে সূত্রভেদে মৃত্যুর তথ্যে পার্থক্য রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব স্টেট অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল হেলথ অফিশিয়ালসের (এএসটিএইচও) ২১ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রকাশনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হামের নিশ্চিত রোগী ছিল ২ হাজার ১৪৪ জন।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: পিবিএস নিউজআওয়ার/এপি, ১৯ আগস্ট ২০২৫; মেডিকেল ডেইলি, ২৬ অক্টোবর ২০২৬; এএসটিএইচও, ২১ জানুয়ারি ২০২৬