বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরি, অর্ধেক জব্দ, সন্দেহের তির উত্তর কোরিয়ার দিকে
ছবিঃ সংগৃহীত
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি (৬.৩ বিলিয়ন) ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরি হওয়ায় তোলপাড় চলছে। চুরি যাওয়া অর্থের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ এখন পর্যন্ত জব্দ করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। বাকিটা এখনো অজ্ঞাত হ্যাকারদের হাতে। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, এ হামলায় উত্তর কোরিয়াভিত্তিক একটি হ্যাকার গোষ্ঠী জড়িত।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, শুরুতে তাদের ধারণা ছিল একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হয়ে নিরাপত্তা ভেঙেছে। পরে তদন্তে একাধিক জায়গায় নিরাপত্তা লঙ্ঘনের প্রমাণ মেলে। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং বলেন, এটি কোনো একক ব্যক্তির হামলা নয়। হ্যাকাররা নিজেদের ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও হামলার চিহ্ন মুছে ফেলার বিশেষ কৌশল কাজে লাগিয়েছে, ফলে তদন্ত আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
ক্রিপ্টো বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস বলছে, হামলার ধরনটি উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট আগের সাইবার হামলাগুলোর সঙ্গে মিলে যায়—যার একটি ২০২৫ সালে বাইবিট এক্সচেঞ্জ থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরি। আরেক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসও উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উচ্চমাত্রার আস্থার কথা জানিয়েছে।
চুরি যাওয়া অর্থ খুঁজে বের করা ও উদ্ধারে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস। সংস্থাটি জানিয়েছে, অর্থের গতিপথ অনুসরণ, সম্পদ জব্দ ও উদ্ধারের পাশাপাশি জড়িত সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত করতে তারা দিনরাত কাজ করছে। এফবিআইয়ের সঙ্গেও কাজ করছে বাইন্যান্স।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বাইন্যান্সের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সচেঞ্জ এ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে চুরি যাওয়া সম্পদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট টেথার ও সার্কেলের মতো ডলারের বিপরীতে মূল্য নির্ধারিত স্টেবলকয়েনও আছে।
গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বাইন্যান্স বলেছে, তাঁদের অর্থ নিরাপদ এবং চুরির কারণে গ্রাহকের যে ক্ষতি হবে, তা প্রতিষ্ঠানটি পুষিয়ে দেবে। তবে এত বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য নিয়ে ক্রিপ্টো বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতিকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা ভাবার সুযোগ নেই; দরকার হলে ক্ষতিগ্রস্তদের আদালতে যেতে হতে পারে।
লন্ডনের আইনজীবী ড্যানিয়েল টাঙ্কেলের মতে, ক্ষতিপূরণ মিলবে কি না, তা নির্ভর করবে গ্রাহকদের সঙ্গে বাইন্যান্সের চুক্তির শর্ত এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগের ওপর।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বাইন্যান্সের নিবন্ধিত ব্যবহারকারী বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটির বেশি। গত পাঁচ বছরে ক্রিপ্টো খাতের একাধিক বড় সাইবার চুরির জন্য উত্তর কোরিয়ার লাজারাস গ্রুপসহ দেশটির বিভিন্ন হ্যাকার গোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন তদন্তকারীরা। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সীমিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে অর্থ জোগাড়ে সাইবার অপরাধকে কাজে লাগায় উত্তর কোরিয়া। তবে পিয়ংইয়ং বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
প্রেক্ষাপট
আল জাজিরার ৩০ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুরি শুরু হয় ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাতে এবং বেশির ভাগ অর্থ সরানো হয় প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, টিআরএম ল্যাবস লাজারাস গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট উত্তর কোরীয় ইউনিট ‘ট্রেডারট্রেইটর’-কে দায়ী করেছে; ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির বাইবিট হ্যাকের জন্যও এফবিআই এই ইউনিটকেই দায়ী করেছিল।
সংখ্যার হিসাব
চেইনঅ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়া ২০০ কোটি ডলারের কিছু বেশি ক্রিপ্টো চুরি করে, যা আগের বছরের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি — দ্য রেজিস্টার ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: আল জাজিরা, ৩০ অক্টোবর ২০২৬; দ্য রেজিস্টার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫