রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতি হামলায় নিহত অন্তত ১৩: স্থলযুদ্ধ, মার্কিন সহায়তা না মিত্রদের ভরসা—সব পথেই ঝুঁকি সৌদির
ছবিঃ সংগৃহীত
সৌদি রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে অন্তত ১৩ জনের প্রাণহানির পর রিয়াদের ওপর পাল্টা জবাব দেওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।
গত এক দশকেরও বেশি সময়ে সৌদি মাটিতে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। দেশটি এখন কোন পথে পরিস্থিতি সামলাবে, তা নিয়ে জোরালো আলোচনা চলছে। কিন্তু সামনে থাকা প্রতিটি বিকল্পেই রয়েছে বড় ঝুঁকি—হোক তা স্থলযুদ্ধে নামা, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সরাসরি সামরিক সাহায্য চাওয়া, অথবা আন্তর্জাতিক মিত্রদের নিয়ে বিদ্রোহীদের মোকাবিলা।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর পাশে দাঁড়াতে গত সপ্তাহে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল সৌদি আরব। কিন্তু এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিদ্রোহীরা তাদের অবস্থান থেকে হটেনি; উল্টো সৌদি আরবের ওপর হামলার তীব্রতা আরও বাড়িয়েছে। শনিবার রিয়াদের ওই বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে উত্তেজনা পৌঁছেছে নতুন মাত্রায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরান যে কৌশল অনুসরণ করেছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় আরও বেশি হামলার হুমকি দিয়েছে হুতিরা। তাদের উদ্দেশ্য কেবল সৌদি আরবকে সামরিক চাপে রাখা নয়; বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর অভিঘাত ছড়িয়ে দেওয়া।
সৌদি আরবের প্রতি হুতিদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রিয়াদের দশকজুড়ে চলা যুদ্ধ থেকেই জন্ম নিয়েছে ইয়েমেনের মানবিক সংকট, যা বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ। তবে সাম্প্রতিক হামলাকে এখন অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতেরই বিস্তৃত রূপ হিসেবে দেখছেন।
স্থলযুদ্ধে নামার বিপদ
সামরিক অভিযান আর আলোচনা—দুই পথেই গত ১১ বছর ধরে হুতিদের অগ্রগতি থামানোর চেষ্টা চালিয়েছে সৌদি আরব। তাতে বিদ্রোহীদের শক্তি তেমন একটা কমেনি। বরং ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত করেছে তারা, এমনকি জনবহুল তাইজের মতো এলাকাও দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে সৌদি রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক আলী শিহাবির ভাষ্য, “এই হুমকির স্থায়ী সমাধান করতে হবে।”
শিহাবির ধারণা, রণক্ষেত্রে ইয়েমেন সরকারের বাহিনী কতখানি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে। আকাশপথে সৌদি আরব তাদের ব্যাপকভাবে সহায়তা করছে।
সৌদি আরব এ পর্যন্ত মূলত হুতিবিরোধী ইয়েমেনি জোটকে আকাশ থেকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে; বিপুল সংখ্যায় নিজেদের সেনা সরাসরি স্থল লড়াইয়ে পাঠায়নি। কিন্তু রিয়াদে সর্বশেষ হামলার পর দেশটি এই সংযম ধরে রাখবে কি না, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বড় পরিসরে ইয়েমেনে সেনা পাঠালে দুর্গম এলাকায় দীর্ঘ ও খরুচে স্থলযুদ্ধের ফাঁদে পড়তে পারে সৌদি আরব। পাশাপাশি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটিকে স্থিতিশীল, বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে যে ভাবমূর্তি দিয়েছেন, তাও ধাক্কা খেতে পারে।
আরও শক্তিশালী হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র
প্রায় দুই দশক আগে হুতিরা ছিল একটি ক্ষুদ্র ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন। ইরানের সমর্থন পেয়ে সময়ের পরিক্রমায় তারা হয়ে উঠেছে শক্তিশালী এক সশস্ত্র গোষ্ঠী। বর্তমানে তাদের অস্ত্রভান্ডারে আছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা দিয়ে তেল আবিবের মতো দূরের লক্ষ্যেও আঘাত হানা যায়।
বছরের পর বছর হুতিদের সঙ্গে লড়ে আসা ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলভিত্তিক এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, বিদ্রোহীরা যুদ্ধের কৌশলে উন্নতি ঘটিয়েছে। তাদের হামলা এখন আগের চেয়ে অত্যাধুনিক ও নিয়মিত, বেড়েছে তাদের গোয়েন্দা সক্ষমতাও।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলি অভিযোগ করেছেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মিলে কাজ করে হুতিরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্রকে আরও কার্যকর করেছে। তিনি দাবি করেন, নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গতি বেশি এবং তাপ শনাক্তকারী প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগুলো তাপের উৎস অনুসরণ করে লক্ষ্যে আঘাত করতে সক্ষম। তবে শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।
অস্ত্র উন্নয়নে হুতিদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের বিষয়টিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের ভাষ্য, উত্তর ইয়েমেনভিত্তিক একটি গোষ্ঠী রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য দিকনির্দেশনা সফটওয়্যার তৈরির কাজে তাদের ক্লড এআই প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছে। অস্ত্র যখন উড়ন্ত অবস্থায় থাকে, তখন এর গতিপথ নিয়ন্ত্রণে রাখা ও স্থির রাখার কাজে এ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়। প্রতিবেদনে গোষ্ঠীটির পরিচয় জানানো হয়নি; তবে ওই এলাকা হুতি-নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় গোষ্ঠীটির সঙ্গে হুতিদের যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত মেলে।
মিত্রদের দুয়ারে রিয়াদ
হুতিদের মোকাবিলায় নানা দেশের কাছে সমর্থন চেয়েছে সৌদি আরব। সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এসেছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের কাছ থেকে। তুরস্কের মতো অন্য মিত্রদেশগুলোও সহযোগিতার কথা ভেবে দেখছে।
সিরিয়ার কাছেও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সাহায্য চেয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে। প্রায় দশ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে সিরিয়া থেকে হটাতে সক্ষম হয়েছিল।
অন্যদিকে রিয়াদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হুতিদের ওপর বিমান হামলায় যোগ দেয়নি। এর বদলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে ১০০ জনের বেশি সামরিক উপদেষ্টা, যারা নতুন গঠিত যৌথ কমান্ডের আওতায় গোয়েন্দা সহায়তা দেবেন।
ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে গত বছর যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছায় যুক্তরাষ্ট্র। এ যুদ্ধবিরতির ফলে মার্কিন জাহাজের জন্য আবার খুলে যায় বাব আল-মানদেব প্রণালি, যা ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার বিশ্ববাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। কয়েকটি সূত্র তখন সিএনএনকে জানিয়েছিল, গত মাসে দু’বার আলাপের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হুতিদের ওপর হামলা চালানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন সৌদি যুবরাজ। কিন্তু ট্রাম্প তাতে রাজি হননি।
আলী শিহাবি মনে করেন, মার্কিন বিমানবাহিনী সরাসরি যুক্ত হলে সৌদি আরব লাভবান হতো। তার যুক্তি, স্যাটেলাইটলব্ধ গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন বিমান দ্রুত অভিযান চালাতে পারে, অথচ সৌদি বিমানবাহিনীকে এ প্রক্রিয়ায় বাড়তি একটি ধাপ পেরোতে হয়।
নিহতদের মধ্যে মার্কিন নাগরিক, ট্রাম্পের ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্র থেকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনা সত্ত্বেও ঝুঁকি কাটেনি সৌদি আরবের। বিস্তীর্ণ মরুভূমিজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দেশটির জ্বালানি স্থাপনাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হুতিদের তুলনামূলক সস্তায় বানানো একমুখী ড্রোনের সহজ নিশানায় পরিণত হতে পারে।
রবিবার সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের একজন মার্কিন নাগরিক। এ ঘটনা সংঘাতে আরও প্রত্যক্ষভাবে জড়ানোর জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
হামলার পর সাংবাদিকদের উদ্দেশে ট্রাম্পের মন্তব্য, “সৌদিরা ভালো যোদ্ধা। তবে আমার মনে হয়, হামলাটি ছিল ভয়াবহ।”
হুতিদের বিরুদ্ধে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র শামিল হবে কি না, জানতে চাইলে তার উত্তর ছিল, “আমরা যোগ দিতে পারি।”
প্রেসিডেন্টের এ বক্তব্যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা একেবারে বাতিল করা যাচ্ছে না। তবু সৌদি আরবের সামনে বড় প্রশ্নটি রয়েই গেছে: দীর্ঘ স্থলযুদ্ধের ঝুঁকি কাঁধে নেবে, নাকি আন্তর্জাতিক সহায়তায় ভর করে হুতিদের সামাল দেবে? সূত্র: সিএনএন