ছবিঃ সংগৃহীত
সিম কার্ড, মোবাইল টাওয়ার কিংবা ওয়াই-ফাই—কোনোটি ছাড়াই যোগাযোগের সুযোগ দেয় এমন ‘লোরা’ প্রযুক্তির যন্ত্র সম্প্রতি কয়েকটি অভিযানে ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক সূত্র। নতুন ধরনের এই যোগাযোগ প্রযুক্তি ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থার বাইরে গিয়ে প্রযুক্তিটির ব্যবহার নিরাপত্তা নজরদারির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ দাঁড় করাচ্ছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘লং রেঞ্জ, লো পাওয়ার’ কথাটি থেকেই ‘লোরা’ নামের উৎপত্তি। প্রযুক্তিটি বানানো হয়েছে অল্প শক্তি খরচ করে তুলনামূলক বেশি দূরত্বে তথ্য আদান-প্রদান করার লক্ষ্যে। ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনডিটিভির প্রতিবেদন বলছে, উদ্ধার হওয়া যন্ত্রগুলোর কয়েকটি এনক্রিপ্টেড ও মেশভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থায় কাজ করতে সক্ষম। এর অর্থ, সংকেত এক যন্ত্র থেকে আরেক যন্ত্রের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া যায় এবং সে ক্ষেত্রে সরাসরি মোবাইল টাওয়ারের দরকার পড়ে না।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, লস্কর-ই-তৈয়বার কমান্ডার মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মুসা ফৌজি গত ২৯ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন; ঘটনাস্থল ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের বুদগাম জেলার গুরওয়াতকালান এলাকা। ‘লোরা আল্ট্রা’ লেখা একটি যন্ত্র তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছে।
বনাঞ্চলে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে বার্তা, জিপিএস অবস্থান ও জরুরি সংকেত এ ধরনের যন্ত্রের সাহায্যে পাঠানো যায়—এমন দাবি ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি যন্ত্র আরেকটির সংকেত পৌঁছে দিতে পারে বলে একাধিক যন্ত্র মিলে নিজেদের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত যোগাযোগ নেটওয়ার্কও গড়ে তুলতে পারে।
দাচিগাম ও পাহেলগামের মাঝের পাহাড়ি বনাঞ্চলে এর আগে ভারতীয় বাহিনীর ‘অপারেশন মহাদেব’ চলাকালেও একাধিক এনক্রিপ্টেড লোরা যন্ত্র এবং সিমবিহীন ফোন উদ্ধার হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। তদন্তকারীরা দাবি করেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা এসব যন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে তো বটেই, সীমান্তের ওপারে থাকা যোগাযোগকারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতেন।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ আছে, উদ্ধার করা যন্ত্রগুলোর কয়েকটি স্থানীয়ভাবে তৈরি নয়—এমন ধারণা করা হয়েছে ভারতের ন্যাশনাল টেকনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (এনটিআরও) ফরেনসিক বিশ্লেষণে। ভারতীয় নিরাপত্তা সূত্র দাবি করেছে, যন্ত্রগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্ট যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এনক্রিপ্ট করা অবস্থায় ছিল। অবশ্য এসব দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য প্রতিবেদনটিতে নেই।
পাকিস্তান ও চীনের প্রযুক্তিগত যোগসূত্রের প্রসঙ্গও এসেছে প্রতিবেদনটিতে। ভারতীয় নিরাপত্তা সূত্র অভিযোগ করেছে, সীমান্তের ওপারে যোগাযোগ করার জন্য যন্ত্রগুলোকে আগেই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল; এগুলোতে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। এই দাবির পক্ষেও স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে হাজির করা হয়নি।
এনডিটিভি জানিয়েছে, নতুন এই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসার পর থেকে দক্ষিণ কাশ্মীরের বনাঞ্চলে নিজেদের নজরদারি ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে দেখছে নিরাপত্তা বাহিনী। স্পেকট্রাম স্ক্যানার এবং সংকেত বাধাগ্রস্তকারী যন্ত্রের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথাও এসেছে, যাতে লোরা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত বেতার তরঙ্গ শনাক্ত করা যায়।
লোরা অবশ্য নিজে গোপন কিংবা অপরাধমূলক কোনো প্রযুক্তি নয়। স্বল্প শক্তি খরচ করে দূরপাল্লায় যোগাযোগের কাজে সারা বিশ্বেই এটি বৈধভাবে ব্যবহৃত হয়। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রযুক্তিটির অপব্যবহারের অভিযোগ।
সূত্র: এনডিটিভি