হরমুজ এড়াতে বিকল্প তেলপথের খোঁজে ইরাক, তুরস্কের সঙ্গে বড় চুক্তির প্রস্তুতি
ছবিঃ সংগৃহীত
নতুন একটি কাঠামোগত চুক্তির বিষয়ে তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে ইরাক, যার উদ্দেশ্য তেল, গ্যাস ও জ্বালানি খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানো। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন চলার মধ্যে দেশটি তেল রফতানির জন্য যে বিকল্প পথের সন্ধান করছে, এ আলোচনা তারই অংশ।
ইরাক ও তুরস্কের কর্মকর্তারা এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেন শুক্রবার, তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায়। তেল ও গ্যাস খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, তেল-গ্যাস ও জ্বালানি বাণিজ্য এবং দুই দেশের যৌথ কার্যক্রমের পরিসর বড় করার বিভিন্ন উপায় বৈঠকের আলোচনায় উঠে আসে।
এক বিবৃতিতে ইরাকের তেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের তেল ও গ্যাস খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়াতে সম্ভাব্য একটি রূপরেখা বৈঠকে আলোচিত হয়েছে। গুরুত্ব পেয়েছে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের পাশাপাশি তেল, গ্যাস ও জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রসঙ্গও। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার জন্য দুই দেশের যৌথ কাজের কাঠামো ও সমন্বয়কে আরও কার্যকর করার উপায় নিয়েও কথা বলেছেন কর্মকর্তারা।
হরমুজ সংকটে বিকল্প রফতানি পথ
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই। প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত; সেখানকার সংকটের কারণে নিজের তেল রফতানি অবকাঠামো এবং রফতানি করিডোরে বৈচিত্র্য আনতে সচেষ্ট হয়েছে ইরাক।
তেল রফতানি ইরাকের অর্থনীতির পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাগদাদ তাই গুরুত্ব দিচ্ছে স্থলপথে তেল পরিবহনের সুযোগ বাড়ানোর দিকে, যাতে উপসাগরীয় জলপথের ওপর নির্ভরতা কমে।
সেই ধারাবাহিকতাতেই গত আগস্টে এক বছরের একটি তেল পরিবহন চুক্তিতে সই করে ইরাক ও তুরস্ক। দুই দেশের আগের চুক্তিটির মেয়াদ ফুরিয়েছিল জুলাইয়ের শেষ দিকে। নতুন চুক্তিকে সে সময় ‘অস্থায়ী চুক্তি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সালিম আল-রুকাবি। তিনি জানিয়েছিলেন, চুক্তিটির আওতায় তেল রফতানি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে পাইপলাইনের পূর্ণ সক্ষমতা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে।
আগস্টের শুরুতে ইরাকের তেলমন্ত্রীও জানিয়েছিলেন বাগদাদের একটি পরিকল্পনার কথা—সিরিয়া ও তুরস্কের ভেতর দিয়ে তেল রফতানি বাড়িয়ে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের ওপরে নেওয়া।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পথে দুই দেশ
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্ট দিয়ে তুরস্কের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদমন্ত্রী আলপারসলান বায়রাকতার জানান, ইরাকের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন তুরস্কের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে।
তুরস্ক ও ইরাকের মধ্যকার জ্বালানি সম্পর্ককে নতুন ও আরও শক্তিশালী স্তরে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—এ কথা বলেন বায়রাকতার। তিনি উল্লেখ করেন, আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপরিশোধিত তেল পরিবহনের চুক্তিটি গত আগস্টে সই হয়েছিল তুরস্কের রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস পাইপলাইন কোম্পানি বোটাস, ইরাকের রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন সংস্থা সোমো এবং নর্থ অয়েল কোম্পানির মধ্যে। বায়রাকতার জানান, সেই চুক্তিকে ভিত্তি ধরে দুই দেশ এবার এমন একটি চুক্তির রূপরেখা দাঁড় করাচ্ছে, যা হবে নতুন, দীর্ঘমেয়াদি ও আরও বিস্তৃত। তিনি বলেন, দুই দেশের যৌথ কর্মদলগুলোকে সক্রিয় করা হবে, যাতে তেল ও গ্যাসের অবকাঠামো, অনুসন্ধান, বাণিজ্য, পরিশোধন, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প এবং বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্প চূড়ান্ত করা যায়।
কিরকুক-জেহান পাইপলাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
কিরকুক-জেহান তেল পাইপলাইনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ইরাক-তুরস্ক জ্বালানি সহযোগিতার আলোচনায়। বায়রাকতার জানিয়েছেন, দক্ষিণ ইরাকের বসরা পর্যন্ত পাইপলাইনটির সম্প্রসারণ এবং সেটির পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধিকে আঙ্কারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। তিনি মনে করেন, উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা গেলে হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর যে নির্ভরতা, তার শক্তিশালী একটি বিকল্প গড়ে উঠবে।
পাইপলাইনটি ইরাকের উত্তরাঞ্চলের কিরকুক তেলক্ষেত্র থেকে শুরু হয়ে পৌঁছেছে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর জেহানে; ইরাকের তেল রফতানির ক্ষেত্রে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ইরাকি তেল স্থলপথে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ মেলে এই পাইপলাইন দিয়ে।
জাহাজ চলাচল নিয়ে হরমুজ প্রণালিতে এখন যে সংকট চলছে তা অব্যাহত থাকলে ইরাকের কাছে এমন বিকল্প রফতানি করিডোরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে তুরস্কের সামনেও সুযোগ আসতে পারে—মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানির সরবরাহ ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থানকে আরও মজবুত করার।
ফলে শুক্রবারের আলোচনাকে কেবল স্বল্পমেয়াদি তেল পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে সীমিত করে দেখা হচ্ছে না। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যালসহ গোটা জ্বালানি খাতে ইরাক-তুরস্কের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি গড়ার একটি উদ্যোগ হিসেবেও একে বিবেচনা করা হচ্ছে।