আরামকো স্থাপনায় হুতি হামলার দাবি, ব্রেন্ট ক্রুড ছাড়াল ১০৮ ডলার
ছবিঃ সংগৃহীত
বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে; বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি বাড়ে, যার পেছনে ছিল মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ। ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনায় নতুন করে হামলার দাবি করার খবরে দামের এ উল্লম্ফন ঘটে।
বৃহস্পতিবার একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের সীমা পেরিয়ে যায় ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বর ফিউচার, যা বিশ্ববাজারে তেলের দামের প্রধান মানদণ্ড। দিন শেষে দাম থাকে ১০৬ দশমিক ৫০ ডলারের ওপরে। এশিয়ার বাজারে শুক্রবার সকালে দাম খানিকটা নামলেও ১০৫ ডলারের ওপরেই থাকে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ঘিরে উদ্বেগ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আগে থেকেই বাড়ছিল। একদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন, অন্যদিকে হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোও।
রিয়াদ ও আরামকো স্থাপনায় হামলার দাবি
হুতিদের বৃহস্পতিবারের দাবি অনুযায়ী, সৌদি রাজধানী রিয়াদে একটি ‘সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তু’ এবং লোহিত সাগর তীরের ইয়ানবু শহরে আরামকোর স্থাপনাকে নিশানা করে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দুটি অভিযানই ‘সফলভাবে লক্ষ্য অর্জন করেছে’ বলে উল্লেখ করা হয় হুতি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত বিবৃতিতে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ অবশ্য নিশ্চিত করেনি, এসব হামলায় হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না। তাইফ ও ইয়ানবু অভিমুখে হুতিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে বলে জানান সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি।
সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো ইয়ানবু। হরমুজ প্রণালিতে জটিলতা দেখা দেওয়ার পর সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে এ বন্দরের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
আরামকো ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কোম্পানি হওয়ায় সৌদি আরামকোর উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা রপ্তানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠার আশঙ্কা আছে।
গত কয়েক সপ্তাহে একাধিকবার হামলার মুখে পড়েছে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো। ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ড্রোন হামলার পর। পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলো এই পাইপলাইনের মাধ্যমেই ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত, আর এতে হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ মেলে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এরপর পূর্বাঞ্চলীয় উপসাগরীয় বন্দরগুলো ব্যবহার করে রপ্তানি বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে সৌদি আরব; হরমুজ হয়ে সৌদি তেলের পরিবহনও আগের তুলনায় বেড়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই নতুন উত্তেজনা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যখন কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, ঠিক সে সময়েই তেলের দাম বাড়ল। দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে, যার লক্ষ্য সাত মাস ধরে চলা সংঘাত অবসানের সম্ভাব্য সমাধান খোঁজা।
যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আগের সমঝোতা স্মারকে ওয়াশিংটন নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ফিরে আসবে—বৃহস্পতিবার এমন আশা প্রকাশ করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে কোনো শান্তিচুক্তি ছাড়াই ওই সমঝোতা আগস্টের মাঝামাঝি কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়।
বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দাম বৃদ্ধির চাপ কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে খানিকটা কমতে পারে। তবে বাজারে বাড়তি ঝুঁকির প্রিমিয়াম থেকে যেতে পারে ততদিন, যতদিন জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ ও অবকাঠামো ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।
আল-জাজিরাকে সিডনিভিত্তিক কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ ও স্থাপনাগুলো এখনো ঝুঁকিতে থাকায় যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তুলনায় তেলের দাম এখনো বেশ চড়া। তিনি মনে করেন, জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে চলা কূটনৈতিক তৎপরতা বাজারে খানিকটা ভারসাম্য আনলেও দাম ঊর্ধ্বমুখী চাপে থাকতে পারে, যতক্ষণ না উত্তেজনা স্থায়ীভাবে কমার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।
যুদ্ধ চললে ১০০ ডলারের ওপরে থাকতে পারে তেল
ইরান যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরেই থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক জুন গোহ। তিনি জানান, সংঘাতের কোনো সুস্পষ্ট সমাধান না আসায় বিশ্বজুড়ে তেলের মজুদ ঘাটতি আরও বেড়ে চলেছে।
সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এর আগেও বেড়েছিল, যার কারণ ছিল ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা এবং ইয়ানবু দিয়ে রপ্তানিতে বিঘ্ন। বিকল্প পথ ব্যবহার করে সৌদি আরব পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলেও গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথ—হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—উভয়ই এখন আঞ্চলিক সংঘাতের ছায়ায় রয়েছে।
এ কারণে হুতিদের সর্বশেষ হামলার দাবিতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে যেমন নতুন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি উদ্বেগ বেড়েছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিয়েও। তেলের দামে তারই তাৎক্ষণিক প্রতিফলন ঘটেছে।