প্রকল্পের হিসাব থেকে ১৯৫০০ কোটি টাকায় তেল আমদানি, প্রকল্পে প্রভাব পড়বে না দাবি বিপিসির
ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেলের আমদানি সচল রাখতে বিভিন্ন প্রকল্পের হিসাবে থাকা ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কাজে লাগিয়েছে; এসব প্রকল্পের মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বা ইআরএল-২-ও রয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় রকমের সংকট তৈরি হয়েছে এবং তার জেরে আমদানিতেও দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা; এমন প্রেক্ষাপটেই সংস্থাটি এ অর্থ ব্যবহার করে।
অর্থ ব্যবহারের এ তথ্য এসেছে বিপিসির কার্যপত্রে, যেটি জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির প্রথম বৈঠকে মঙ্গলবার উপস্থাপনের জন্য তৈরি। কার্যপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গিয়ে বিপিসিকে মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এমন অবস্থায় সংস্থাটি গত সাত মাস জ্বালানি তেলের আমদানি চালু রেখেছে ইআরএল-২সহ বিভিন্ন প্রকল্প খাত থেকে এ পর্যন্ত নেওয়া ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়ে।
যে প্রকল্পগুলোর হিসাব থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, এর ফলে সেসব প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হবে কি না—এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিপিসি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, অর্থটি বিপিসির নিজস্ব; কখন কোন প্রকল্পে কত টাকা দরকার পড়বে তা হিসাব কষে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অর্থের পুনর্বিন্যাস হয়েছে, ফলে প্রকল্পের কাজে এর কোনো প্রভাব পড়বে না।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, নানা প্রকল্পের হিসাবে যে অর্থ রাখা ছিল, সেটি বিপিসিরই অর্থ। প্রকল্পগুলোর জন্য চলতি এবং আগামী অর্থবছরে কোন সময়ে কত টাকার দরকার হবে, সেই প্রয়োজন মাথায় রেখেই পুনর্বিন্যাসের কাজটি হয়েছে; এর জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে নতুন করে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি।
বৈঠকের কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখার জন্য চলতি মূলধন হিসেবে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষিত রাখতে হয়, যা দুই মাসের তেলের মূল্যের সমান। তবে তেল ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করায় বিপিসির চলতি মূলধন হ্রাস পেয়েছে। মার্চ থেকে অগাস্ট—এই ছয় মাসে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বলে সংস্থাটির হিসাব।
কার্যপত্রের তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের গড় দাম ছিল ৮৬ ডলার, যা মার্চে বৃদ্ধি পেয়ে ১৮৬ দশমিক ৫৯ ডলারে পৌঁছায়। ব্যারেলপ্রতি ২৮৪ দশমিক ৯৫ ডলার—ডিজেলের এই সর্বোচ্চ দাম ওঠে এপ্রিলে। আর সেপ্টেম্বরে কার্যপত্র প্রস্তুত করার সময় পর্যন্ত গড় দাম ছিল ১৬৫ দশমিক ৮২ ডলার।
সবশেষ দফায় মূল্য সমন্বয়ের পর ডিজেলে খরচ তুলতে গেলে প্রতি ব্যারেলের দাম ১১০ ডলার হওয়া দরকার। সে কারণে এখনকার মূল্যেও লোকসান গুনছে বিপিসি।
জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি দেশে চালু হয়েছিল ২০২৪ সালের মার্চে। তখন থেকে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রতি মাসেই সমন্বয় হয়ে আসছিল। কার্যপত্রের ভাষ্য, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্চ থেকে দাম ব্যাপক হারে চড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় দেশে প্রায় পাঁচ মাস স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি মেনে দাম বাড়ানো হয়নি।
এই সময়ের মধ্যে ১৯ এপ্রিল প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকায় উন্নীত করা হয়। এরপর ১ জুন ডিজেল ১১৫ টাকায় রেখে কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা ও পেট্রোল ১৪০ টাকা করা হয়। সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর চার ধরনের জ্বালানি তেলেই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে দাম বাড়ে। বর্তমানে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা ও পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।