বকেয়া দেনমোহর স্ত্রী চাইলেই দিতে হবে, অপেক্ষার সুযোগ নেই: হাইকোর্ট
ছবিঃ সংগৃহীত
হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে বলেছেন, বিয়ের সময় যে দেনমোহর বকেয়া রাখা হয়, স্ত্রী পরে তা চাওয়ামাত্র স্বামী তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন। এর ফলে বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা স্বামীর মৃত্যুর মতো কোনো ঘটনা পর্যন্ত স্ত্রীকে এই দেনমোহরের জন্য আর অপেক্ষায় থাকতে হবে না।
যুগান্তকারী এই পর্যবেক্ষণ ও রায় এসেছে বিচারপতি আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে; দেনমোহর-সংক্রান্ত একটি সিভিল রিভিশন মামলা নিষ্পত্তি করে বেঞ্চ তা দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিটি মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
আদালত পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি যদি দেনমোহর দিতে অকারণে গড়িমসি বা কালক্ষেপণ করেন এবং তা আদায়ে স্ত্রীকে আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করেন, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত স্বামীকে মূল দেনমোহর ছাড়াও স্ত্রীকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দিতে পারবেন।
কোনো আদালতেরই এমন আইনি এখতিয়ার নেই যে দেওয়ানি চুক্তি বা আইনের সুস্পষ্ট ব্যত্যয় ঘটিয়ে দেনমোহরের কোনো অংশ কমাবেন, হ্রাস করবেন কিংবা মওকুফ করে দেবেন; কোনো অবস্থাতেই তা করা যাবে না—এ বিষয়টিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।
প্রসঙ্গত, বকেয়া দেনমোহরের বিষয়টি বিদ্যমান মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালায় উল্লেখ আছে; কিন্তু ঠিক কবে বা কখন তা শোধ করতে হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট আইনি ব্যাখ্যা ছিল না। এ কারণে সমাজে এমন একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিল যে বকেয়া দেনমোহর চাওয়া যায় শুধু বিবাহবিচ্ছেদ অথবা স্বামীর মৃত্যুর পরেই। দীর্ঘদিন ধরে চলা সেই আইনি অস্পষ্টতা ও জট কাটল হাইকোর্টের এ আদেশের মাধ্যমে।
আদালত রায়ে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরা থেকে প্রাসঙ্গিক আয়াত উদ্ধৃত করে উল্লেখ করেছেন, দেনমোহর ফেলে রাখার বা বকেয়া রাখার কোনো অবকাশ ইসলামে রাখা হয়নি; এটি বরং স্ত্রীর এমন এক প্রাপ্য অধিকার, যা তাৎক্ষণিক ও অবিচ্ছেদ্য।
দেশের আইনি অঙ্গন এবং নারীর অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে এ রায়কে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার ইশরাত হাসান। তিনি বলেন, বকেয়া দেনমোহর আদায় করতে গিয়ে নারীরা দীর্ঘদিন যে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছিলেন, এ রায়ে সেই পথ রুদ্ধ হলো। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হয়েও দেনমোহর শোধ করা নিয়ে টালবাহানার সুযোগ কোনো স্বামী আর পাবেন না। নারীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রশ্নে দেশের বিচারিক ইতিহাসে এই রায় একটি বড় নজির হিসেবে থেকে যাবে।