দাওয়াতে তাবলিগ: নবীদের রেখে যাওয়া মেহনত
ছবিঃ সংগৃহীত
দাওয়াতে তাবলিগ কোনো ব্যক্তি বা দলের কাজ নয়; মহান আল্লাহর প্রেরিত মহাপুরুষ নবী-রসুলদের কাজ এটি। পথ হারানো মানুষকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনাই এর কাজ। বিদায় হজের ভাষণে নবীজি (সা.) বলেছেন, আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও পৌঁছে দাও। নবীওয়ালা এ কাজ মূলত সে সময় থেকেই উম্মতের জিম্মায় আসে। তখন থেকে একদল মর্দে মুমিন কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে দুনিয়ার যাবতীয় লোভ-লালসা ও আরাম-আয়েশ ছেড়ে দাওয়াতে তাবলিগের মেহনত চালিয়ে যাচ্ছেন।
মানুষের জীবনে ইমান ও আমলের চেতনা জাগ্রত করাই এ মেহনতের মূল লক্ষ্য। দাওয়াতের মূল কথা হলো—মানুষ যেন তার সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারে, তাঁর দেখানো পথে জীবন চালাতে পারে এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সঙ্গে সঙ্গে আখিরাতের স্থায়ী জীবনের জন্যও প্রস্তুতি নিতে পারে। এ কারণে কোনো শ্রেণি-পেশা কিংবা এলাকার মানুষের মধ্যে এ মেহনত সীমিত নয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে দীনের কথা পৌঁছানো।
দাওয়াত ও তাবলিগের এ মেহনত মূলত আত্মশুদ্ধি ও সংশোধনের একটি পথও বটে। এতে অন্যের কাছে দীনের কথা তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ইমান, আমল, আখলাক ও চরিত্র সংশোধনেরও চেষ্টা থাকে। এ মেহনতের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো নামাজ, ইলম ও জিকিরের প্রতি যত্নশীল হওয়া, মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং রসুল (সা.)-এর সুন্নাহকে জীবনে ধারণের চেষ্টা। ব্যক্তি এভাবে বদলে গেলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ ও বৃহত্তর পরিসরেও। দুনিয়ার ব্যস্ততা ও ভোগের প্রতিযোগিতার মধ্যে মানুষ যখন ক্রমে তার সৃষ্টিকর্তা ও আখিরাতের কথা ভুলে যায়, দীনের এ মেহনত তখন তাকে আবার স্মরণ করিয়ে দেয় তার মূল পরিচয়। দাওয়াতের কেন্দ্রীয় বার্তা এই উপলব্ধি যে মানুষের প্রকৃত সফলতা সম্পদ, পদ-পদবি বা দুনিয়ার সাফল্যে নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। মানুষের কাছে সেই বার্তা পৌঁছাতে মুমিনরা যুগ যুগ ধরে ব্যয় করে আসছেন নিজেদের সময়, শ্রম ও সামর্থ্য।
এই নবীওয়ালা কাজ যাঁরা আনজাম দেবেন, তাঁদের থাকতে হয় এক আশ্চর্য শক্তি, যার নাম ধৈর্যশক্তি। সবর না থাকলে দাওয়াতের মেহনতে সফলতার কোনো সম্ভাবনা তো থাকেই না, বরং পদে পদে শয়তানের ওয়াসওয়াসার চোরাবালিতে আটকে গুনাহের গর্তে হারিয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়। সুতরাং সবরের মতো কঠিন গুণ যাঁরা আয়ত্ত করতে পারেননি কিংবা পারবেন বলেও মনে হয় না, অন্তত সবরের ওপর অটল থাকার চর্চাটুকু যাঁদের নেই, তাঁদের জন্য দাওয়াতের এ কঠিন নবীওয়ালা কাজ কোনোভাবেই নয়। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘ওয়ামা ইউলাক্কাহা ইল্লাল্লাজিনা সবারু, ওয়ামা ইউলাক্কাহা ইল্লা জুহাজ্জিল আজিম। অর্থ: দাওয়াতের কঠিন কাজের আনজাম তারাই দিতে পারে, যারা চরম ধৈর্যশীল। দাওয়াতের কাজে সফল তারাই হয়, যারা পরম সৌভাগ্যবান’ (সুরা হামিম সেজদাহ-৩৬)।
ধৈর্যের অর্থ যেমন অনেক, রূপও অনেক। দাওয়াতের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের অন্তত এতটুকু ধৈর্য থাকা চাই—কেউ গালি দিলে তাঁরা জবাব দেবেন হাসি দিয়ে; কেউ তাঁর পথ আটকালে তিনি সেই ব্যক্তির জন্য পথ খুলে দেবেন; কেউ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে তিনি তার জন্য ষড়যন্ত্রের সেই জাল কেটে দেবেন; আর কেউ তাঁর ঘর ভেঙে দিলে, আশ্রয় কেড়ে নিলে দায়ি তাকে ঘর করে দেবেন, আশ্রয় খুঁজে দেবেন। এমন সুন্দর আচরণ কেবল কাফের-মুশরিকদের বেলায় নয়, নিজ সাথি ভাইদের সঙ্গে বরং আরও বেশি করে দেখাতে হবে। নবীজি (সা.)-এর গোটা জীবন খুঁজে দেখলে আমরা এটিই পাই।
এই দাওয়াতি আচরণ নবীজি (সা.) কোথা থেকে শিখলেন? শিখেছেন তাঁর প্রভু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে। নবীর মতোই মহৎ চরিত্রের অধিকারী যেন তাঁর উম্মত হতে পারে, বিশেষ করে নবীওয়ালা কাজের আনজাম যাঁরা দেবেন, তাঁদের উদ্দেশে আল্লাহ বলছেন, ‘ইদফা বিল্লাতি হিয়া আহসান। ফাইজাল্লাজি বাইনাকা ওয়া বাইনাহু আদাওয়াতুন কাআন্নাহু ওয়ালিউন হামিম। তোমার সঙ্গে যারা মন্দ আচরণ করে তাদের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো আচরণটি কর। তাহলে দেখবে যে তোমার জানের দুশমন ছিল সে তোমার জানের দোস্ত হয়ে গেছে’ (সুরা হামিম সেজদাহ-৩৪)।
গভীর মনোযোগে খেয়াল করুন, এখানে এ কথা বলা হয়নি যে তুমি কোনো কাফের-মুশরিকের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো আচরণ কর। বলা হয়েছে বরং—তোমার সঙ্গে মন্দ আচরণকারী যে-ই হোক না কেন, তার সঙ্গে চরমতম ভালো আচরণ কর। তা হলেই সে হয়ে উঠবে তোমার সবচেয়ে কাছের হিতাকাঙ্ক্ষী-শুভাকাঙ্ক্ষী-বন্ধু।
লেখক: প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট