নামাজ-ইস্তেগফার থেকে মজুতদারি রোধ: সংকট উত্তরণে ইসলামের দিকনির্দেশনা
ছবিঃ সংগৃহীত
ভালোভাবে বাঁচার ইচ্ছা প্রত্যেক মানুষেরই আছে; সবাই চায় জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত হোক। দুঃখ-কষ্ট, অভাব কিংবা সংকট কারও কাম্য নয়। তবু চাওয়ামাত্রই কি সব মেলে? বহু মানুষকে ঘিরে ধরে ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর অর্থকষ্ট। এর চাপে অনেকে হতাশায় তলিয়ে যায়, আল্লাহর কাছ থেকে আরও দূরে সরে পড়ে, পা বাড়ায় অন্ধকারের পথে। তাই একজন মুমিনের আকিদা, চরিত্র, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবন যেন সংকটে না পড়ে, সে বিষয়ে ইসলাম পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সেগুলোর কয়েকটি নিচে আলোচনা করা হলো।
বিনয়ের সঙ্গে নামাজ
সংকট যত বড়ই হোক, নামাজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আমল আর নেই। বিপদ এলে আমরা নানা রকম আমল খুঁজে বেড়াই; অথচ সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নামাজের মধ্য দিয়ে সমাধান প্রার্থনা করা। আল্লাহ বলেন, ‘আর ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য গ্রহণ কর। নিশ্চয়ই নামাজ বড় কঠিন, তবে বিনয়ীদের নিকট (কঠিন) নয়।’ (সুরা বাকারা : আয়াত-৪৫)।
ক্ষমাপ্রার্থনা বা ইস্তেগফার
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, অর্থাৎ ইস্তেগফার, একটি মহৎ আমল। এতে সচ্ছলতা ফেরে, সংকটও দূর হয়। নবী হুদ (আ.) তাঁর জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘আর হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আপন রবের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর অভিমুখী হয়ে যাও। তিনি তোমাদের ওপর আসমান থেকে মুষলধারে (বৃষ্টি) বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির সঙ্গে আরও শক্তি বাড়িয়ে দেবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।’ (সুরা হুদ : আয়াত-৫২)।
পরিকল্পিত পদক্ষেপ
পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হয়। স্বপ্ন দেখেছিলেন মিসরের বাদশাহ রাইয়ান ইবনে ওলিদ—‘সাতটি মোটাতাজা গাভি-ওদের খেয়ে ফেলছে সাতটি শীর্ণ গাভি এবং সাতটি সবুজ শিষ ও আরও সাতটি শুষ্ক শিষ।’ সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নবী ইউসুফ (আ.) বুঝলেন, সামনের সাত বছর দেশে দুর্ভিক্ষ হবে। তাই দুর্ভিক্ষের ধাক্কা সামলে ওঠার জন্য তিনি বাদশাহকে একটি পরিকল্পনা দিলেন। সেই পরিকল্পনার কথা কোরআনে এসেছে এভাবে—‘তিনি (ইউসুফ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তোমরা লাগাতার সাত বছর চাষাবাদ করবে। অতঃপর যে শস্য তোমরা কাটবে, তা শিষসহ রেখে দেবে, তবে সামান্য পরিমাণ ছাড়া, যা তোমরা খাবে। এরপর আসবে কঠিন সাতটি বছর, যা এ সাত বছরের জন্য তোমরা যে (ফসল) সঞ্চয় করে রেখেছিলে তা খেয়ে ফেলবে, তবে সামান্য পরিমাণ ছাড়া, যা তোমরা (বীজের জন্য) সংরক্ষণ করবে।’ (সুরা ইউসুফ : আয়াত-৪৭-৪৮)।
সঞ্চয় গড়ে তোলা
শরিয়তসম্মত উপায়ে সম্পদের প্রয়োজনীয় হক আদায়ের পর সঞ্চয় গড়ে তোলা এবং ওয়ারিশদের জন্য কিছু সম্পদ রেখে যাওয়াই শ্রেয়। ‘সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর অন্তিম শয্যায় রসুল (সা.) তাঁকে দেখতে যান এবং বলেন, তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের অসহায় হয়ে মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে স্বাবলম্বী করে রেখে যাওয়া উত্তম।’ (সহিহ বুখারি : হাদিস-১২৯৫)।
সম্পদের সুরক্ষা
সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তা না হলে সম্পদ রক্ষা পাবে না, বড় কোনো সংকটও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। কোরআনের ভাষ্য, ‘আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে যে সম্পদ তাঁর রসুলকে দিলেন, তা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের এবং আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের জন্য, যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তন না করে।’ (সুরা হাশর : আয়াত-৭)।
ব্যয়ে ভারসাম্য
ভেবেচিন্তে সঠিক জায়গায় খরচ করা মুমিনের দায়িত্ব। যেখানে-সেখানে অঢেল ব্যয় করা যেমন আপত্তিকর, তেমনি দরকারের সময় পকেট থেকে টাকা বের করতে না চাওয়াও সমান দোষণীয়। আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি তোমার হাত নিজ ঘাড়ের সঙ্গে বেঁধে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্তও করে দিয়ো না।’ (সুরা ইসরা : আয়াত-২৯)।
মজুতদারি ঠেকানো
সংকট থেকে উত্তরণ চাইলে যেকোনো উপায়ে মজুতদারি বন্ধ করতে হবে। এ কাজে প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকাই সবচেয়ে বড়। ইসলামেও মজুতদারি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমদানিকারী রিজিকপ্রাপ্ত এবং মজুতকারী অভিশপ্ত।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদিস-২১৫৩)।
লেখক : শিক্ষা সচিব ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ