চার দশক পেরিয়ে ৪১ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি
ছবিঃ সংগৃহীত
১৯৮৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পথচলা শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (ডুজা); সংগঠনটি এবার প্রতিষ্ঠার ৪১ বছরে পদার্পণ করল। চার দশক ধরে পেশাদারি বজায় রেখে সমিতিটি সংবাদমাধ্যমে তুলে আনছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ঘটনা।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় আয়োজন ছিল আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সমিতির সাবেক ও বর্তমান সদস্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিকরা এতে যোগ দেন। বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতা এবং ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার গুরুত্বের প্রসঙ্গ।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও সাংবাদিকতার পরিধি বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সাংবাদিকতা কতখানি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল—সে বিষয়ে নতুনভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। গণমাধ্যম ও সাংবাদিক সংখ্যায় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতার গুণগত মান ও সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা-ও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
‘ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে হবে’—এ কথা এখন খুব বেশি ব্যবহৃত হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রশ্ন শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে করলেই চলবে না, সাংবাদিকদের নিজ কর্মক্ষেত্রের ক্ষমতাকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন ওঠা দরকার। সাংবাদিকের কর্মক্ষেত্রে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সম্পাদকও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। শ্রমের যথাযথ মূল্য ও বেতন সাংবাদিক পাচ্ছেন কি না, সে বিষয়টিরও আলোচনায় উঠে আসা উচিত।
সালেহ শিবলী বলেন, কোনো নতুন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরুর আগে সাংবাদিক ও কর্মীদের নিয়মিত বেতন পরিশোধের সক্ষমতা সেটির আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময়ের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য না থাকা অবস্থায় হঠাৎ করে সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা অনলাইন গণমাধ্যম চালু করা হলে সেখানকার সাংবাদিক ও কর্মীদের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।
তাঁর কথায়, ‘ধুমধাম করে পত্রিকা বের করলাম, দুই মাস পর আর বের করলাম না’—এ ধরনের অবস্থা সাংবাদিকদের জন্য পেশাগত অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। গণমাধ্যমে যোগদানের কিছুদিনের মাথায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া বা মালিকপক্ষকে আর খুঁজে না পাওয়া—এমন ঘটনার অবসান হওয়া প্রয়োজন।
সাংবাদিকতার দায়িত্বের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকার শুধু সাংবাদিকদের একার নয়, সে অধিকার জনগণেরও। রাষ্ট্রটি জনগণের, আর নির্বাচিত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার তুলে দেয় জনগণই। প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা সেসব প্রশ্ন আরও সংগঠিত ও কার্যকর উপায়ে জনগণের সামনে হাজির করতে পারে।
সাংবাদিকদের নিজেদের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ এবং পেশাগত কাঠামো যাতে আরও শুদ্ধ ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে, সেদিকে তিনি গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি তাঁর আহ্বান ছিল পেশাগত সৌহার্দ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা ধরে রাখার।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ আয়োজনে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি আনন্দিত—এ কথা বলেন সমিতির সাবেক সভাপতি ও গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া। সমিতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বর্তমান ও সাবেক সদস্যদের তিনি শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, সমিতিতে থাকাকালীন সহকর্মী ও জ্যেষ্ঠদের সঙ্গে বহুদিন পর একসঙ্গে হওয়ার সুযোগ মিলেছে। এমন আয়োজনে সাংবাদিকদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।
সংবাদ বস্তুনিষ্ঠভাবে পরিবেশন করা সহজ কাজ নয়; তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা দক্ষতার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সে দায়িত্ব পালন করে আসছেন—এ কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলমোজাদ্দেদী আলফেসানী। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক কার্যক্রম যেমন তাঁদের প্রতিবেদনে জায়গা পায়, তেমনি উঠে আসে নানা সমস্যা ও অসংগতিও।
তাঁর বক্তব্য, বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রতিবেদন অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়ক হয়। সে কারণে সাংবাদিক ও প্রশাসনের মধ্যে দায়িত্বশীল সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতা থাকা জরুরি।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজনের প্রস্তাব দেন তিনি, জোর দেন নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর। তাঁর মন্তব্য, এ ধরনের প্রশিক্ষণ পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো, তথ্য যাচাই, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বক্তারা বলেন, ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাংবাদিকরা সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরেন একাডেমিক কার্যক্রম, গবেষণা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও অর্জন এবং ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশ; এভাবেই তাঁরা বৃহত্তর সমাজের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র হাজির করেন।
তাঁদের আরও বক্তব্য, ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় সংবাদ পরিবেশনের সময় ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকা, তথ্যের যথার্থতা যাচাই করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।
আলোচনা সভার পর শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তাতে আমন্ত্রিত অতিথিদের পাশাপাশি সমিতির সাবেক ও বর্তমান সদস্যরা অংশ নেন। চার দশক পার করে ৪১ বছরে পা রাখার এই উপলক্ষে সংগঠনের ঐতিহ্য, পেশাগত মান এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার প্রত্যয় জানান ডুজার সদস্যরা।