আগাম শীতের সবজিতে ভাগ্য ফেরানোর স্বপ্ন টাঙ্গাইলের কৃষকের
ছবিঃ সংগৃহীত
শীতের আগমনে এখনো বাকি প্রায় তিন মাসেরও বেশি সময়। এর মধ্যেই আগাম সবজির আবাদ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন টাঙ্গাইলের কৃষকেরা। আশ্বিনের শুরুতেই জেলার দিগন্তজোড়া মাঠে সবুজের সমারোহ ছড়িয়েছে আগাম শীতকালীন সবজি; এর পেছনে রয়েছে অনুকূল আবহাওয়া, কৃষি অধিদপ্তরের পরামর্শ, আধুনিক প্রযুক্তি ও নিবিড় পরিচর্যা।
ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় স্থানীয় কৃষকেরা শীতকালীন সবজির আবাদ ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন। এ কাজে তাঁরা নিচ্ছেন মানসম্মত বীজ ব্যবহারের কারিগরি সহায়তা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ।
তাঁদের এখন ব্যস্ততা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় শীতকালীন সবজির আবাদ নিয়ে। মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, দেশি লাউ, গাজর ও শিমসহ নানা ধরনের শীতকালীন সবজি ইতিমধ্যে মাঠে মাঠে চোখে পড়ছে।
রকমারি সবজিতে এখন ভরে উঠেছে কৃষিজমি, বিশেষ করে সবজি চাষের জন্য খ্যাত পাহাড়ি অঞ্চল মধুপুর, ঘাটাইল, ধনবাড়ী, সখিপুর এবং যমুনা ও ধলেশ্বরী অববাহিকার চরাঞ্চলে। অনুকূল আবহাওয়া পাওয়ায় ফসল ফলাতে সফল হচ্ছেন চাষিরা। নতুন শীতকালীন সবজির ভালো দাম মিলবে—এমন আশায় কৃষকদের আগ্রহ আগের তুলনায় আরও বাড়ছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সরেজমিনে গিয়ে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সারি সারি শাকসবজির আবাদ। মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, লাউ, টমেটো, লালশাক, পালংশাক ও পুঁইশাকসহ নানা শীতকালীন সবজির চাষ শুরু হয়েছে বেশির ভাগ জমিতে। আগাম জাতের লালশাক, মুলা ও লাউ কোথাও কোথাও ইতিমধ্যে বাজারে আসতে শুরু করেছে।
মৌসুমের গোড়ায় নতুন সবজির চাহিদা বেশি, তাই বাজারে ভালো দাম মিলছে কৃষকদের। কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষক-কৃষানিরা; তাঁদের আশা বেশি ফলন ও কাঙ্ক্ষিত লাভ। নতুন চারা রোপণের জন্য কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ মাটি দিচ্ছেন চারার গোড়ায়, আবার কেউ নিড়ানি ও রোগবালাই দমনে বালাইনাশক স্প্রে করছেন। সবজির পরিচর্যা ও চারা উৎপাদনে পুরুষদের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীরাও সমানতালে ভূমিকা রাখছেন।
স্বাভাবিক সময়ের আগেই বাজারে সবজি তোলা গেলে লাভ দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত হয় বলে জানান স্থানীয় চাষিরা।
এমন লাভের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টাঙ্গাইলে গত কয়েক বছর ধরে বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে আগাম শীতকালীন সবজি আবাদের ধুম পড়েছে। আগাম সবজি চাষের জন্য বিশেষ করে যমুনা ও ধলেশ্বরীর চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি অঞ্চলের উর্বর মাটি খুবই উপযোগী; এ কারণে জেলায় আবাদের পরিধি প্রতিবছরই বাড়ছে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর এ অঞ্চলের সবজি ট্রাকে করে প্রতিদিন চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে।
ফুলকপিখেতের পরিচর্যায় এখন ব্যস্ত সময় কাটছে মধুপুর উপজেলার দরিহাসিল গ্রামের কৃষক রায়হান কাজীর। তাঁর জমি ইতিমধ্যে সবুজে ভরে উঠতে শুরু করেছে। তাঁর ৭০ শতাংশ জমিজুড়ে সারি সারি ক্যাপটেন ও উইনার জাতের ফুলকপি শোভা পাচ্ছে।
বাসসকে তিনি বলেন, ৭০ শতাংশ জমিতে ক্যাপটেন ও উইনার জাতের ফুলকপির ১৬ হাজার চারা লাগিয়েছেন তিনি। এখন পর্যন্ত ১ লাখ টাকার কিছু বেশি খরচ হয়েছে, আর মাস দুয়েক পর কপি বিক্রি করতে পারবেন। ফলন ভালো হলে এবং ন্যায্য দামে বিক্রি করা গেলে খরচ বাদ দিয়ে আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা লাভ হবে বলে তাঁর আশা।
রায়হান কাজী আরও বলেন, গ্রীষ্মকালীন সবজির বাজারদর ভালো থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন আশানুরূপ হয়নি। সে জন্য লাভের প্রত্যাশায় শীতকালীন সবজির চাষ তিনি দ্রুত শুরু করেছেন।
ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী ইউনিয়নের ফুলমালীর চালা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ৪০ শতাংশ জমিতে তিনি শিম ও লাউয়ের চাষ করেছেন এক মাস আগে। গাছ বেশ ভালো হয়েছে এবং ইতিমধ্যে কিছু গাছে ফল ধরতে শুরু করেছে। তাঁর আশা, এ বছর ফলন ভালো হবে; ন্যায্য দামে বিক্রি করা গেলে তিনি লাভবান হবেন।
আগাম জাতের ফুলকপি সুস্বাদু হওয়ার পাশাপাশি এর ভেষজ গুণও আছে—বাসসকে এ কথা বলেন মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মমতাজ বেগম।
তিনি বলেন, মধুপুর উপজেলায় এবার মাঠ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ২ হেক্টর জমিতে এ চাষের সম্প্রসারণ ঘটানো হয়েছে; প্রণোদনার আওতায় কৃষি কর্মকর্তার সহায়তায় তা করা হয়। কৃষকেরা কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার ও সহায়তা পেয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ পদ্ধতির ফলে আগামীতে উপজেলার আরও অনেক কৃষক আগাম সবজি চাষে উৎসাহিত হবেন।
টাঙ্গাইলে এ বছর শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ১১ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে, আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৯৪ হাজার ২২০ মেট্রিক টন—বাসসকে এ কথা বলেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সোয়েব মাহমুদ।
তিনি বলেন, কিছু এলাকার কৃষকেরা বেশি লাভের প্রত্যাশায় আগাম শীতকালীন সবজির চাষ ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন। তবে শীতকালীন সবজি চাষ নিয়ে তাঁদের পুরোদমে ব্যস্ততা শুরু হবে আগামী অক্টোবর থেকে। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে, লাভবান হবেন কৃষকেরাও। এর পাশাপাশি নিরাপদ ও মানসম্মত সবজি উৎপাদনের বিষয়েও কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।