ছবিঃ সংগৃহীত
রাজধানী আদ্দিস আবাবা পর্যন্ত গড়িয়েছে ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের লড়াই; সেখানে সরকারি বাহিনী ও সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর জোটের মধ্যে চলা সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
রাজধানীতে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় ভোররাতে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাতে জানা যায়।
প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গেও বৃহত্তর যুদ্ধ বেধে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে, কেননা একই সময়ে দেশটির উত্তরাঞ্চলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ভোর হওয়ার আগে আদ্দিস আবাবায় বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা যায় বলে তিনটি কূটনৈতিক সূত্র ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে। ইথিওপিয়ার কর্তৃপক্ষ এর কয়েক ঘণ্টা আগেই রাজধানী এবং এর আশপাশের এলাকায় ড্রোন ওড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ইথিওপিয়ান পিপলস’ ফোর্সেস অ্যালায়েন্স ফর সারভাইভাল নামের জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, রাজধানীতে জোটটি কয়েকটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং সেগুলোর কয়েকটিতে নিশানা করা হয় সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তরকে।
অবশ্য হামলাগুলোতে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিংবা কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
সাত সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট
সাতটি সশস্ত্র গোষ্ঠী আছে সরকারবিরোধী এ জোটে। সেগুলোর মধ্যে তিগ্রায় পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ) যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আমহারা, আফার, সোমালি ও বেনিশানগুল-গুমুজ অঞ্চলের কয়েকটি সশস্ত্র সংগঠনও।
প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারকে তারা ক্ষমতাচ্যুত করতে চায় বলে দাবি করেছে জোটটি।
পাল্টা অভিযোগ তুলে ইথিওপিয়ার ফেডারেল সরকার বলছে, এ জোটের পেছনে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের সমর্থন রয়েছে। অভিযুক্ত দেশগুলো অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সবশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী, সরকারি বাহিনী ও জোটের যোদ্ধারা আফার অঞ্চলেও সংঘর্ষে জড়িয়েছে। একই সময়ে ইরিত্রিয়ার বাহিনী আফারে প্রবেশ করেছে বলে ফের অভিযোগ তুলেছে ইথিওপিয়া। এ নিয়ে ইরিত্রিয়ার তরফ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
তিগ্রায়ের দিকে এগোচ্ছে সরকারি বাহিনী
আমহারা অঞ্চল থেকে সূচনা হওয়া লড়াই আরও উত্তরে গিয়ে তিগ্রায়ের গভীরে বিস্তৃত হয়েছে বলে বুধবার আফার অঞ্চল থেকে জানান কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদক মুহাম্মদ তাহা তাওয়াকেল।
তাঁর প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তরমুখী অগ্রযাত্রায় সরকারি বাহিনী তিগ্রায়ের আঞ্চলিক রাজধানী মেকেলের প্রায় ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছে।
অন্যদিকে নিজেদের যোদ্ধাদের নতুন অবস্থানে নিয়ে গেছে টিপিএলএফ। তাওয়াকেল জানান, মেকেলে ছেড়ে অন্য জায়গায় সরে গেছেন সংগঠনটির কয়েকজন নেতাও।
মেকেলে ছেড়ে পালিয়েছেন হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ, সংঘর্ষ বেধে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাঁদের এই পলায়ন। অঞ্চলটিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ।
বড় পরিসরের একটি অভিযানে গত সপ্তাহে নামে তিগ্রায়ের বাহিনী। টিপিএলএফ একে আখ্যা দিয়েছে ‘প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ’ বলে। ফেডারেল বাহিনীর ড্রোন ও গোলাবর্ষণের পাল্টা জবাব হিসেবেই এই অভিযান বলে দাবি তাদের।
পরে সরকারি বাহিনী এবং তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাল্টা অভিযানে নামলে উত্তর ইথিওপিয়ার নানা এলাকায় দ্রুত বিস্তার ঘটে সংঘাতের।
আফারে নতুন করে সংঘর্ষ
দিন দিন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে আফার অঞ্চলের পরিস্থিতিও। তিগ্রায় সীমান্তের লাগোয়া দুই শহর ইরেবতি ও আবালা পুনর্দখল করার কথা রয়টার্সকে জানিয়েছে ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী। এ দাবির সত্যতা অবশ্য রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
শহর দুটির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে তখনো লড়াই চলছিল বলে বুধবার জানান আল-জাজিরার তাওয়াকেল। সংঘর্ষে লিপ্ত বাহিনী যাতে আবালা ও ইরেবতি ছেড়ে যায়, সে জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের মাধ্যমে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি।
ওই এলাকায় ৮০ হাজারের বেশি আফার বাসিন্দা আটকা পড়েছেন; তাঁরা এখন কী অবস্থায় আছেন, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
ইরিত্রিয়া-ইথিওপিয়া যুদ্ধের আশঙ্কা
আফারে সংঘাত বৃদ্ধির ফলে শুধু ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ নয়, গোটা হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলজুড়েই নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
তাওয়াকেলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আফারের লড়াই আরও জোরালো হয়ে উঠলে সরাসরি বৃহত্তর যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়া। এ ছাড়া ইথিওপিয়া ও জিবুতির মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও সরবরাহপথ ব্যাহত হলে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে খাদ্যনিরাপত্তাও।
প্রতিবেদনটিতে আরও জানানো হয়, সংঘর্ষ বিস্তৃত হয়েছে ইরিত্রিয়া ও সুদান সীমান্তের লাগোয়া এলাকাগুলোতেও। এর ফলে যে সংঘাত এত দিন প্রধানত উত্তরাঞ্চলেই সীমিত ছিল, সেটি আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হওয়ার শঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বুধবার আল-জাজিরাকে আফারের উপ-গভর্নর আহমেদ হুসেইন বলেন, নজিরবিহীন একটি হামলার সম্মুখীন হয়েছে ইথিওপিয়া। তিনি দাবি করেন, আফার আঞ্চলিক প্রশাসনকে দুর্বল করে দেওয়া আর সেখানে ইরিত্রিয়ার প্রতি অনুগত ব্যক্তিদের ক্ষমতায় বসানোই এ হামলার উদ্দেশ্য।
ইরিত্রিয়ার সেনাদের আফার ভূখণ্ড থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে যেসব এলাকা বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানকার বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার দায় তিনি ইরিত্রিয়ার ওপরই চাপান।
আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে
কয়েক বছর আগের তিগ্রায় যুদ্ধের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে ইথিওপিয়ার চলমান পরিস্থিতি। তিগ্রায় ও আমহারা ছাড়াও এবার আফারে বিস্তৃত হয়েছে সংঘাত; তার ওপর রাজধানীতে ড্রোন হামলার দাবি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
রাজধানীতে বিস্ফোরণের ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে সেটি হবে সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। পাশাপাশি ইরিত্রিয়া ও সুদান সীমান্তের কাছের লড়াই আর জিবুতি-সংযোগকারী বাণিজ্যপথ ঘিরে সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাত আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত সংঘর্ষে কতজন হতাহত হয়েছেন এবং কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র মেলেনি। তা সত্ত্বেও রাজধানীতে বিস্ফোরণ, সরকারি বাহিনীর তিগ্রায়মুখী অগ্রযাত্রা আর আফারে ইরিত্রিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার অভিযোগ মিলিয়ে উত্তর ইথিওপিয়ার পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। সূত্র: আল-জাজিরা