আবরার হত্যার সাত বছর: রায় কার্যকরের অপেক্ষায় দিন গুনছেন বৃদ্ধ মা-বাবা
ছবিঃ সংগৃহীত
আসামিদের আবেদন আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বহুল আলোচিত ও নৃশংস আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা; চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়নি এখনো। বুয়েটের এই শিক্ষার্থীকে হত্যার সাত বছর পূর্ণ হলো আজ বুধবার (৭ অক্টোবর)। মামলায় ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত, যা পরে হাইকোর্টেও বহাল থাকে।
আবরারের পরিবার অপেক্ষা করছে সাত বছর ধরে। তাদের ভাষ্য, আদালত একটির পর একটি রায় দিলেও সেই অপেক্ষার শেষ হচ্ছে না; রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে অগ্রগতির বিষয়টিই এখন তাদের বিশেষভাবে হতাশ করছে।
ভাইয়ের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকেই নয়, নাড়া দিয়েছিল দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও—এ কথা জানান আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ। তিনি দাবি করেন, আবরারকে হত্যার পর মানুষের মনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তার প্রভাব পড়েছিল পরের রাজনৈতিক পরিবর্তনে।
ফাইয়াজ মুঠোফোনে বলেন, ফ্যাসিবাদের বিদায়ের শুরুটা হয়েছিল আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই। অথচ যাদের কারণে আজকের এই পরিবর্তন, সেই হত্যার বিচারই এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি।
তিনি বলেন, হাইকোর্ট ২০২৫ সালের মার্চে রায় দেওয়ার পরও তাঁদের অপেক্ষা চলছে। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করা হলে তাঁদের বলা হয়েছে, সিরিয়াল ধরেই মামলা এগোয়।
ফাইয়াজের কথায়, সিরিয়াল এগিয়ে আনার সুযোগ আছে, তবে সেটি করতেও তাঁরা দ্বিধায় থাকেন। প্রয়োজনীয় সব জায়গাতেই পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। অপেক্ষা করা ছাড়া এ মুহূর্তে তাঁদের আর কিছুই করণীয় নেই।
রায় কার্যকর করতে বাধাটা কোথায়—সে প্রশ্ন তুলে ফাইয়াজ বলেন, বিষয়টি তাঁদের পরিবার জানে না। এখন মনে হচ্ছে, এটা নিছক অবহেলা, অন্য কিছু নয়।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই—এমন মন্তব্য করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুষ্টিয়া জেলা কমিটির সদস্য সচিব সুলতান মাহমুদ তালহা বলেন, সেই ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে, আর নতুন সরকার সুবিধা ভোগ করছে ফাহাদের হত্যার ওপর ভর করে। আবরার ফাহাদ হত্যার আসামিদের রায় কার্যকর করা উচিত তাদের। রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়—এই দাবি কেবল তাঁর নিজের নয়, দেশের প্রত্যেক মানুষের।
আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহর কণ্ঠেও একই রকম ক্ষোভ। তিনি মুঠোফোনে বলেন, সরকার পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গেই কমে যায় আবরার হত্যা মামলার গুরুত্বও। আসামিদের রায় কার্যকর হোক—এটা কেবল তাঁর পরিবার চায় না, চায় সারা বাংলাদেশের মানুষ। এরপরও রায় কার্যকর করা হচ্ছে না। এ নিয়ে একা তিনি নন, হতাশ দেশের সবাই।
বরকত উল্লাহ বলেন, সুষ্ঠু বিচার এখন পর্যন্ত তাঁদের ভাগ্যে জোটেনি। বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে তিনি সরকারের প্রতি আবেদন জানান।
তাঁর কথায়, ছেলে দেশের সেরা বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা করতে গিয়ে এভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হবে—এমনটা তাঁদের কল্পনাতেও কখনো আসেনি।
ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন বিষয়ে অন্যায্য চুক্তির প্রসঙ্গে আবরার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর। এর পরদিন রাতে তাঁকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়; সেখানে চলে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর। নির্যাতন চলাকালে একপর্যায়ে ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে তিনি মারা যান। তাঁর মরদেহ পরদিন হলের সিঁড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়।
বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে পড়তেন আবরার। তাঁকে হত্যার পর সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ে বুয়েটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররাজনীতি, আবাসিক হলে নির্যাতন ও ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের প্রভাব।
চকবাজার থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন আবরারের বাবা, তিনিই এর বাদী। পুলিশ তদন্ত শেষ করে ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়, যাতে আসামি করা হয় বুয়েটের ২৫ শিক্ষার্থীকে।
বিচারকাজ চলে দুই বছরেরও বেশি সময়। এরপর ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার আদালতের রায়ে ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
পরে হাইকোর্টে শুনানি হয় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের আপিলের ওপর। ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন সাজা হাইকোর্টেও বহাল থাকে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ।
কিন্তু সেখানেই মামলার ইতি ঘটেনি। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন জানিয়েছেন আসামিদের কয়েকজন। এ কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষা থেকেই যাচ্ছে।
সাজা ঘোষণা নয়, বিচারপ্রক্রিয়া কোথায় গিয়ে শেষ হবে—সেটিই এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বলে মন্তব্য আবরারের পরিবারের।
সাত বছর আগের সেই রাতের স্মৃতি আজও টাটকা কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডে আবরারদের বাড়িতে। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট—একে একে সব ধাপ পার হয়ে মামলাটি এখন পৌঁছেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। পিটিআই রোডের ওই বাসায় গতকাল গেলে জানা যায়, ঢাকায় আবরারের ছোট ভাইয়ের কাছে অবস্থান করছেন তাঁর মা-বাবা।
রায় ঘোষিত হয়েছে, বহাল রয়েছে সাজাও। তবু সাত বছর পেরিয়ে গেলেও অপেক্ষার প্রহর ফুরোয়নি আবরারের পরিবারের।