ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষকের মর্যাদা
ছবিঃ সংগৃহীত
জাতি গঠনের মূল কারিগর হলেন শিক্ষক। মানবতা নির্মাণে ও জ্ঞান-গবেষণার উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার সীমা-পরিসীমা নেই। শিশুদের চরিত্র গড়ে দেওয়া, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং তাদের দায়িত্বশীল নাগরিক করে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকের যে ভূমিকা, তা অস্বীকারের উপায় নেই।
শিক্ষার্থীর বিবেক আলোকিত হয় শিক্ষকদের অর্জিত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোয়। প্রত্যেক ছাত্রকে দায়িত্বশীল, গবেষক ও ভবিষ্যতের কাণ্ডারি রূপে তৈরি করতে তাঁরা নিজেদের সবটুকু ঢেলে দিয়ে চেষ্টা করে যান। কেবল ইসলামে নয়, পৃথিবীর সব মতাদর্শ ও সমাজেই শিক্ষকতা পেশাটি বিশেষ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত।
অবশ্য শিক্ষককে সর্বাধিক মর্যাদা দিয়েছে ইসলামই। অসংখ্য গুণের অধিকারী হয়েও মহানবী (সা.) নিজের পরিচয় দিয়েছেন শিক্ষক বলে। তাঁর বাণী, ‘আমাকে শিক্ষক হিসেবে পাঠানো হয়েছে’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৯)।
শিক্ষকের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল নবী, সাহাবি ও তাবেইনদের স্বর্ণযুগে। পাঠদানের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের উচ্চপদস্থ নানা দায়িত্বেও নিযুক্ত করতেন খলিফা হজরত ওমর (রা.)। আর খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর উক্তি, ‘আমাকে যিনি একটি অক্ষর শিক্ষা দিলেন, আমি তাঁর ক্রীতদাস। চাইলে তিনি আমাকে মুক্ত করতে পারেন কিংবা বিক্রিও করে দিতে পারেন’ (তালিমুল মুতাআল্লিম, পৃষ্ঠা : ২১)।
শিক্ষকতা মহান আল্লাহর গুণ
সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক স্বয়ং মহান আল্লাহ। ভালোমন্দের সবকিছু তিনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন নবী-রসুলদের মারফত। কোরআনের ভাষায়, ‘আল্লাহকে ভয় করতে থাক। আল্লাহ তোমাদের শিক্ষা দান করেন এবং আল্লাহ সব বিষয় সম্বন্ধে সম্যক অবগত।’ (সুরা বাকারা : ২৮২)।
নবীদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালন
নবী-রসুলরা যে দায়িত্ব রেখে গেছেন, একজন শিক্ষক সেটিই পালন করে থাকেন। মানুষকে শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়া, অর্থাৎ শিক্ষকের ভূমিকায় থাকা ছিল দুনিয়ায় নবী পাঠানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে তোমাদেরই মধ্য থেকে একজন রসুল পাঠিয়েছি; যিনি তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তোমাদের পরিশুদ্ধ করেন, তোমাদের কিতাব ও গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দেন এবং তোমাদের এমন সব বিষয় শিক্ষা দেন, যা তোমরা জানতে না’ (সুরা বাকারা : ১৫১)।
সর্বোত্তম পেশা
দুনিয়ায় পেশার সংখ্যা অগণিত হলেও মর্যাদার বিচারে শিক্ষকতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো আর কোনো পেশা নেই। রসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে নিজে কোরআন শিক্ষা করেন এবং অন্যকে শিক্ষা দেন’ (বুখারি : ৫০২৭)।
সৃষ্টিকুলের দোয়া
সৃষ্টিকুলের সবাই যাঁর জন্য দোয়া করে চলে, সেই মানুষটি হলেন শিক্ষক। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-এর বর্ণনা করা এক হাদিসে নবী (সা.)-এর বাণী, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমান ও জমিনের সব সৃষ্টি, এমনকি গর্তের পিপীলিকা এবং সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণ শিক্ষাদাতার জন্য দোয়া করতে থাকে’ (সুনানে তিরমিজি : ২৬৭৫)।
নবীজির দোয়া
প্রিয়নবী (সা.) স্বয়ং শিক্ষকের জন্য বিশেষ দোয়া করে গেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে তরতাজা রাখুন; যে আমার কোনো কথা শুনেছে, স্মরণ রেখেছে এবং যেভাবে শুনেছে সেভাবে মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছে’ (সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৬)।
মৃত্যুর পরও দোয়া পাওয়ার উপায়
মানুষ মারা গেলে তার আমলের সব দরজা রুদ্ধ হয়ে যায়। তবে শিক্ষকতা পেশাটি যথাযথভাবে পালন করে গেলে এবং আদর্শবান ছাত্র তৈরি করে যেতে পারলে কবরে থেকেও সওয়াব মেলে। রসুল (সা.)-এর বাণী, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার তিনটি আমল ব্যতীত সব আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ১. সদকায়ে জারিয়া। ২. এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং ৩. এমন সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে’ (সুনানে আবু দাউদ : ২৮৮)।
সত্যিকারের দরদি শিক্ষক হয়ে ওঠার তৌফিক মহান আল্লাহ আমাদের দিন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ।