গৌরীপুরে ২০ অসচ্ছল নারীর হাতে সেলাই মেশিন তুলে দিল বসুন্ধরা শুভসংঘ
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
গৌরীপুরের স্থানীয় একটি মাদরাসায় আলিমে পড়ছেন মরিয়ম আক্তার রিয়া; বাবা কৃষক, মা গৃহিণী। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং পরিবারের আর্থিক সংকটে পাশে থাকা—এটাই তাঁর স্বপ্ন। কৃষিকাজের সীমিত আয়ে সংসারের খরচ জোগানোই যখন কঠিন, তখন লেখাপড়ার পাশাপাশি আয় করে পরিবারকে সহায়তা করার ইচ্ছা নিয়ে রিয়া সেলাই শেখার উদ্যোগ নেন।
সেই স্বপ্ন পূরণের পথে তাঁর সামনে নতুন একটি সুযোগ এসেছে তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর। বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে, বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে, একটি সেলাই মেশিন পেয়েছেন রিয়া। ফলে পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে বসেই সেলাইয়ের কাজ করে আয় করার সুযোগ হয়েছে তাঁর। রিয়া আশা প্রকাশ করেছেন, পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎও তিনি গড়ে তুলতে পারবেন।
এই সেলাই মেশিন নতুন আশার বার্তা এনেছে কাকলী রানী দাসের জীবনেও, রিয়ার মতোই। তিনি মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছেন। পরিবারে তাঁরা পাঁচ ভাই-বোন, যাঁদের একজন ছাড়া বাকিরা সবাই বেকার। কাকলী দীর্ঘদিন ধরে অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়ছেন; তাই ঘরে বসে কাজ করে আয়ের এই সুযোগ তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বসুন্ধরা গ্রুপের দেওয়া সেলাই মেশিন দিয়ে তিনি নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারবেন।
জীবনের গল্প আলাদা হলেও মরিয়ম ও কাকলীর প্রত্যাশা অভিন্ন—অভাবের কাছে হার মানবেন না, নিজের শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে ভবিষ্যৎ বদলে দেবেন। তাঁদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে নতুন একটি দরজা খুলে দিয়েছে তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে পাওয়া সেলাই মেশিন।
জীবনসংগ্রামে এগিয়ে চলা ২০ জন অসচ্ছল নারীকে সম্প্রতি সেলাই মেশিন ও একটি করে গাছের চারা দেওয়া হয় গৌরীপুর প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে। শংকর ঘোষ পিলুর সভাপতিত্বে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সেলিম আল রাজ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক, বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ও শুভসংঘ প্রধান ইমদাদুল হক মিলন।
অন্যদের মধ্যে অনুষ্ঠানে ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গৌরীপুর সার্কেল) দেবাশীষ কর্মকার, গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. হারুনুর রশিদ, গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ হাবিবুর রহমান, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক আলী আকবর আনিছ, গৌরীপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি বেগ ফারুক আহম্মদ, সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি কাজী আব্দুল্লাহ আল আমান, সাবেক আহ্বায়ক রইছ উদ্দিন, নান্দাইলের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কামরুল হাসান কামু ও গৌরীপুর লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক পলাশ আজহারসহ আরও অনেকে।
অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সেলাই মেশিন দেওয়ার এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলেন গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, একজন নারীর আত্মনির্ভরতার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে একটি সেলাই মেশিন। এটি দিয়ে তাঁরা ঘরে বসেই আয়ের সুযোগ পাবেন, অবদান রাখতে পারবেন পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নেও। সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার এমন উদ্যোগ।
অসচ্ছল নারীদের সেলাই মেশিন দেওয়ার উদ্যোগকে মহৎ ও প্রশংসনীয় বলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবাশীষ কর্মকার। তাঁর বক্তব্য, সেলাই মেশিন শুধুই একটি যন্ত্র নয়; একজন নারীকে তা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ও পরিবারের পাশে থাকার সুযোগ করে দেয়। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর তাঁদের হাতে মেশিন দেওয়ায় উদ্যোগটি আরও অর্থবহ হয়েছে।
প্রধান অতিথি ইমদাদুল হক মিলনের বক্তব্য, দরিদ্র পরিবারের নারীদের স্বাবলম্বী করতে কেবল সেলাই মেশিনই দেওয়া হচ্ছে না, তাঁদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগও এর মধ্য দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। একজন নারী প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে নিজের পরিবারের জন্য আয় করতে পারেন, আবার সমাজ ও দেশের উন্নয়নেও রাখতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও মানবিকতার শিক্ষা দেয় বসুন্ধরা শুভসংঘ।
তাই সেলাই প্রশিক্ষণ শেষে মেশিন পাওয়া ২০ নারীর কাছে এ উদ্যোগ শুধু একটি উপহার পাওয়ার ঘটনা নয়; এটি বরং নতুন এক সম্ভাবনার সূচনা—দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ে তোলার।