চৌদ্দগ্রামে ২০ বন্ধুর ‘গরিবের হাসপাতাল’, টাকার অভাবে থামে না চিকিৎসা
ছবিঃ সংগৃহীত
চিকিৎসার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল অনেক দিনের, যদিও মানুষের আনাগোনা এখানে রোজকার। জায়গাটি মুন্সীরহাট বাজার—কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার পরিচিত এক গ্রামীণ জনপদ, যা আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। চিকিৎসার ব্যয় মেটানো অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ত, বিশেষত নিম্নবিত্ত ও অসচ্ছল মানুষের পক্ষে।
এই বাস্তবতা বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন এলাকারই ২০ বন্ধু। পেশায় তাঁদের কেউ চিকিৎসক, কেউ শিক্ষক, কেউ ব্যাংকার, কেউবা ব্যবসায়ী; নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই প্রতিষ্ঠিত। তবে শহরে থেকে কেবল নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাননি তাঁরা, ভেবেছেন নিজ এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার কথা। এ ভাবনারই ফসল মুন্সীরহাট ক্লিনিক, স্থানীয় লোকজনের কাছে যার পরিচিতি এখন ‘গরিবের হাসপাতাল’ নামে।
অর্থের অভাবে কারও চিকিৎসা যাতে থেমে না যায়—এটাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। রোগীর ঘাড়ে বাড়তি খরচ চাপাতে চিকিৎসার নামে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হবে না; কমিশনের বিনিময়ে পরীক্ষা কিংবা ওষুধের পরামর্শ দিয়ে চিকিৎসার ব্যয়ও বাড়ানো হবে না। এর বদলে গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় সাধ্যের মধ্যে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো হবে।
স্থানীয় ও ক্লিনিক সূত্র জানায়, ক্লিনিকটি গড়ে উঠেছে ২০ জন উদ্যোক্তার উদ্যোগে, যাঁদের ছয়জন চিকিৎসক। তাঁদের পাশাপাশি আরও প্রায় ১৫ জন চিকিৎসক এখানে রোগী দেখে থাকেন। প্রায় সব চিকিৎসকই এ এলাকার বাসিন্দা। উদ্যোগটিতে যুক্ত হয়েছেন আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের চিকিৎসকেরাও; এর মধ্যে রয়েছে বাসন্ডা, যুগীরহাট, মেশতলা, চাঁনপুর, বিষয়ভাগ, ফুলমুড়ি, কাদঘর, কনকপুর, শুভপুর, আনন্দপুর ও খিরনশাল।
এ কারণে রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যে গড়ে উঠেছে একধরনের পারিবারিক সম্পর্ক। এলাকার মানুষকে চিকিৎসকেরা চেনেন; সেই সঙ্গে রোগীর আর্থিক ও পারিবারিক বাস্তবতাও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের অজানা নয়।
মুন্সীরহাট ক্লিনিকে সরেজমিনে দেখা গেল রোগীর বেশ ভিড়। চিকিৎসা নিতে সচ্ছলদের সঙ্গে এসেছেন অনেক নিম্নবিত্ত ও অসহায় মানুষও। এখানে তাঁদের চিকিৎসা ব্যয়ের হিসাবটা অনেকখানি আলাদা।
তাঁদেরই একজন কামাল হোসেন, যিনি একসময় রিকশা চালাতেন; বয়সের ভারে এখন কাটছে অবসর জীবন। সন্তানদের পরিবার থেকে খাবারের ব্যবস্থা হলেও চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা তাঁর পক্ষে কঠিন। তবে এ ক্লিনিকে এসে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ তো নিয়েছেনই, সঙ্গে পেয়েছেন প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা ও বিনামূল্যের ওষুধ।
প্রতিদিন কামাল হোসেনের মতো অনেক রোগী এখানে বিনামূল্যে সেবা পেয়ে থাকেন। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের হিসাব বলছে, কোনো না কোনোভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসাসুবিধা পাচ্ছেন মোট রোগীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
টাকার অভাবে এখানে কারও চিকিৎসা থেমে থাকে না—এমনটাই বলেন স্থানীয় বাসিন্দা সাতবাড়িয়ার সফিকুর রহমান, ফুলমুড়ির হাসান হাজারী, যুগীরহাটের কাজী নজরুল ইসলাম নজির, কনকপুরের দীন মোহাম্মদ ও একই গ্রামের আকমিলমা বেগম। তাঁরা বলেন, সব চিকিৎসক এলাকার হওয়ায় রোগীদের সঙ্গে তাঁদের পরিচয়ও আছে। সামর্থ্যহীনদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়, আর অহেতুক টেস্টও দেওয়া হয় না।
মুন্সীরহাট হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক ইয়াছমিন আক্তার বলেন, হাসপাতালটির উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই তাঁদের সাবেক শিক্ষার্থী। চাইলে তাঁদের অনেকে শহরে থেকে ভালোভাবে জীবন কাটাতে পারতেন। অথচ গ্রামে থেকে এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হয়েছেন তাঁরা। উদ্যোগটি সত্যিই ব্যতিক্রমী।
তিনি আরও বলেন, সচ্ছল রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া বিলও সাধারণত বাজারের তুলনায় কম থাকে। আবার আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে কারও বিলের অর্ধেক বা পুরোটাই মওকুফ করে দেওয়া হয়।
মুন্সীরহাট ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, উদ্যোক্তা ও চিকিৎসক—সবাই এ এলাকারই মানুষ এবং নিজেরাও সচ্ছল। তবে ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য এলাকার অনেকেরই নেই। সে কারণে সাধারণ মানুষের কথা ভেবে কম খরচে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসার খরচ বহনের সামর্থ্য যাঁদের নেই, তাঁরা বিনামূল্যে চিকিৎসা পান। জটিল সমস্যায় ভোগা রোগীর জন্য রোগী কল্যাণ তহবিল থেকে সহায়তা দিয়ে অন্যত্র চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়। তাঁর ভাষ্য, ব্যবসা নয়, সেবাই তাঁদের কাছে মুখ্য; এত ছাড় দিয়েও আলহামদুলিল্লাহ হাসপাতাল ভালোভাবেই চলছে।