
তল্লাশির সময় পরিচয় নিয়ে সন্দেহ: ২ পুলিশ সদস্য ও সোর্সকে বাসে তুলে ক্যাম্পাসে আনলেন কুবি শিক্ষার্থীরা
ছবিঃ সংগৃহীত
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) দুই শিক্ষার্থীকে তল্লাশি করছিলেন দুই পুলিশ সদস্যসহ তিনজন। ছিনতাইকারী সন্দেহে সেই তিনজনকেই ক্যাম্পাসে ধরে নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁদের তুলে নিয়ে যান। পরে বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দীর্ঘ বৈঠকে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়।
মারধরের শিকার তিনজন হলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হানিফ, কনস্টেবল শ্যামল এবং পুলিশের সোর্স জাহিদ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, টিউশন শেষ করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাত হোসেন সিয়াম ও তাঁর বন্ধু অর্প। নগরীর রেসকোর্স এলাকায় তিন ব্যক্তি তাঁদের পথ আটকান এবং পুলিশ পরিচয় দিয়ে তল্লাশি শুরু করেন। শিক্ষার্থীরা পরিচয় জানতে চাইলে পুলিশ সদস্যরা তা দিতে রাজি হননি। একপর্যায়ে তাঁরা ওয়াকিটকি ও হাতকড়া দেখান। এর মধ্যে আরও শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে এলে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়।
ওই ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ জাগায় ছিনতাইকারী ভেবে শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন। বাস থেকে নামানোর পর তাঁদের মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে প্রক্টর অফিসে সোপর্দ করা হলে শনাক্ত হয়, তাঁরা এএসআই হানিফ, কনস্টেবল শ্যামল ও পুলিশের সোর্স জাহিদ।
এরপর প্রক্টর অফিসে কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস তাঁদের পরিচয় পুলিশ সদস্য হিসেবে নিশ্চিত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে বিষয়টি মীমাংসা করে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সিফাত হোসেন সিয়ামের বর্ণনায়, তিনি ও তাঁর বন্ধু অর্প হাঁটছিলেন, অর্প ছিলেন একটু সামনে। হঠাৎ একজন এসে অর্পের বুকে হাত দিয়ে বলেন, ‘আমরা পুলিশ, আপনাদের চেক করব।’ বলেই তিনি অর্পের পকেটে হাত দেন। এরপর তাঁদের পরিচয় আর কোথায় থাকেন, তা জানতে চাওয়া হয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে তাঁরা আইডি কার্ড দেখাতে চান। তখন কালো টি-শার্ট পরা আরেকজন পেছন থেকে সিয়ামের কলার টেনে ধরে বলেন, তাঁরাও পুলিশ।
সিয়াম আরও জানান, তাঁদের আইডি কার্ড দেখাতে বললে তাঁরা তা না দেখিয়ে বারবার হাতকড়া দেখাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে এক স্থানীয় ব্যক্তি এসে বলেন, পুলিশ হলেও এভাবে আচরণ করা উচিত নয়। পরে সিয়াম পাশে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে গিয়ে তল্লাশি করার কথা বলেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাস এলে তাঁদের সেটিতে তুলে ক্যাম্পাসে আনা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. শাহাদাত হোসেনের মতে, এ ঘটনায় দুই পক্ষেরই কিছু ভুল ছিল। পুলিশ সদস্যরাও পরিচয় দিতে চাননি, তাঁদের কাছে আইডি কার্ড ছিল না। আবার শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা প্রক্টরিয়াল বডিকে বিষয়টি জানালে ভালো হতো; তা না করে জোর করে তাঁদের ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা ঠিক হয়নি। তিনি জানান, দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানো গেছে, দুই পক্ষই তা মেনে নিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা। পরে দুই পক্ষের সম্মতিতে লিখিতভাবে সমঝোতা হয় বলেও জানান প্রক্টর।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. লুৎফর রহমান জানান, এ ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিষয়ে প্রক্টর এরই মধ্যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
জেলার প্রেক্ষিত
গত ২৭ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে বসাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন — বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সেদিন এ তথ্য জানায়। সমকালের একই দিনের প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা ১২ বলা হয়েছে, সূত্রভেদে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে। সমকাল জানায়, ওই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রেক্ষাপট সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬; সমকাল, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
