
নভেম্বর-জানুয়ারিতে ৪ থেকে ৬টি শৈত্যপ্রবাহের আভাস, তীব্র রূপ নিতে পারে ২-৩টি
ছবিঃ সংগৃহীত
রোদের তেজ দিনের বেলায় এখনো খুব একটা কমেনি। কিন্তু মাঝরাতে ফ্যানের গতি নামিয়ে দিতে হচ্ছে, ভোরের দিকে গায়ে টেনে নিতে হচ্ছে কাঁথা। শীত যে দরজায়, টের পাওয়া যাচ্ছে এভাবেই। ইট-কংক্রিটের শহরে শীতের আগমন খানিকটা ধীর হলেও উত্তরাঞ্চলের গ্রামে হিমেল বাতাস বইতে শুরু করেছে। সেখানকার খোলা মাঠ আর নদীর পাড় এরই মধ্যে ভোরের নরম কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে।
ঋতুর এই নিঃশব্দ বদলের মধ্যেই শীত নিয়ে বড় এক বার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটি বলছে, সামনের তিন মাসে দেশের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের ৪ থেকে ৬টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
চলতি নভেম্বর থেকে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের জন্য দেওয়া এই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শীত মৌসুমে কয়েক দফায় শৈত্যপ্রবাহ আসতে পারে। কুয়াশা, লঘুচাপ আর ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনার কথাও এতে আছে।
পূর্বাভাসটিতে সই করেছেন অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এবং দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান মো. মমিনুল ইসলাম। এতে বলা হয়, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি, এই তিন মাসে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ৪ থেকে ৬টি শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা আছে। এর ২ থেকে ৩টি তীব্র আকার নিতে পারে।
অধিদপ্তরের মাপকাঠিতে তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে সেটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি হলে মাঝারি, আর ৪ থেকে ৬ ডিগ্রিতে নামলে তীব্র। ৪ ডিগ্রির নিচে গেলে তা অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ।
কখন আর কোন এলাকায় শৈত্যপ্রবাহের দাপট বেশি থাকতে পারে, এমন প্রশ্নে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বাসসকে জানান, সাধারণত ডিসেম্বরে এক থেকে দুটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ দেখা যায়। তাঁর ভাষ্য, দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে, অর্থাৎ রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামতে পারে। সেসব জায়গায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে।
জানুয়ারিতে অবশ্য মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি। ওই মাসে কখনো কখনো একটি বা দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহও আসতে পারে, তখন তাপমাত্রা থাকবে ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।
তিন মাসের এই সময়ে শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কোথাও কোথাও এবং নদ-নদীর অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। অন্য এলাকায় কুয়াশা থাকতে পারে হালকা থেকে মাঝারি।
ঘন কুয়াশায় দিন ও রাতের তাপমাত্রার ফারাক কমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ আছে। এতে শীত বেশি অনুভূত হবে। তবে সব মিলিয়ে এ সময় দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।
কেন এমন হতে পারে, তার ব্যাখ্যায় ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এল নিনো সক্রিয় থাকায় এবং পৃথিবী উষ্ণ অবস্থায় থাকায় এর ছোঁয়া বাংলাদেশেও লেগেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই এর প্রভাব থাকবে। ফলে গড় তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকবে। এ কারণেই এবারের শীতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে বলে তাঁরা বলছেন। তবে মাঝেমধ্যে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে শৈত্যপ্রবাহ বইবে।
তিনি বলেন, শৈত্যপ্রবাহ হবে ঠিকই, কিন্তু অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের দিনক্ষণ, সংখ্যা আর ব্যাপ্তি অনেকটাই কম থাকবে। সে কারণে এবারের শীতকাল কিছুটা ‘উষ্ণ’ থাকতে পারে বলে তাঁরা বলছেন।
এল নিনো সক্রিয় থাকায় শৈত্যপ্রবাহ কয় দিন থাকবে বা কয়বার আসবে, তা নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলেও জানান এই আবহাওয়াবিদ। তাই সতর্ক থাকতে হবে। তবে সার্বিকভাবে এবার কিছুটা ‘উষ্ণ শীতকাল’ পাওয়া যাবে বলেই তাঁদের আশা।
শীতের বাইরে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনাও পূর্বাভাসে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, আগামী তিন মাসে সাগরে ২ থেকে ৪টি লঘুচাপ তৈরি হতে পারে, যার এক থেকে দুটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ড. আবুল কালাম মল্লিক জানান, অক্টোবর ও নভেম্বর দেশে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ মাস। প্রতিবছর এ সময় লঘুচাপ তৈরি হয়, আর কখনো কখনো সেটি শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।
তাঁর ব্যাখ্যা, এ সময় সূর্যের দক্ষিণায়ন চলে। দিন ধীরে ধীরে ছোট হয়, রাত বড় হয়, আর বঙ্গোপসাগর বরাবর সূর্যের আলো বেশি পড়ে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবে প্রতিবছর ঘটে না, মাঝেমধ্যে ঘটে। এ জন্যই একে ট্রানজিয়েন্ট (ক্ষণস্থায়ী) সিস্টেম বলা হয়।
বৃষ্টির বেলায় পূর্বাভাস বলছে, এই তিন মাসে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে নভেম্বরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে চট্টগ্রাম বিভাগে, ৩৫ থেকে ৪০ মিলিমিটার। বরিশাল বিভাগে ৩০ থেকে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। ঢাকা, সিলেট ও খুলনা বিভাগে ১৫ থেকে ২৫ মিলিমিটার, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার আর রংপুর বিভাগে ৪ থেকে ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বৃষ্টি আরও কমবে। ডিসেম্বরে ঢাকা বিভাগে ৮ থেকে ১০ মিলিমিটার এবং সিলেট বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টির আভাস রয়েছে। জানুয়ারিতে খুলনা বিভাগে ১০ থেকে ১৪ মিলিমিটার, আর ঢাকাসহ অন্য বিভাগগুলোতে ৬ থেকে ১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, বিভিন্ন আবহাওয়া-উপাত্ত, ঊর্ধ্বাকাশের আবহাওয়া বিন্যাস, জলবায়ু মডেল এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অনুমোদিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের মডেল পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে এটি তৈরি করা হয়েছে। এল নিনো ও লা নিনা পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস কীভাবে তৈরি হয়, বোঝাতে গিয়ে ড. মল্লিক বলেন, ১৯৪৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অক্টোবর ও নভেম্বরে বঙ্গোপসাগরে কয়টি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময় গড়ে এক থেকে তিনটি লঘুচাপ থাকে। এর কোনো কোনোটি মাঝেমধ্যে শক্তি সঞ্চয় করে। দীর্ঘ সময়ের এমন গড় চিত্রের ওপর দাঁড়িয়েই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দেওয়া হয়।
তবে এ ধরনের পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তা অনেক বেশি থাকে, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি। তাই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের পাশাপাশি নিয়মিত দৈনন্দিন পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখতে বলেছেন এই আবহাওয়াবিদ।
এদিকে গত অক্টোবরে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৮ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। ওই মাসে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল সিলেটে, ১৭ অক্টোবর ৩৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ২৭ অক্টোবর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়, ১৫.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত মাসে দেশের সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে যথাক্রমে ১.৮, ০.৪ ও ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
প্রেক্ষাপট
আবহাওয়া অধিদপ্তর গত শীতেও জানুয়ারির শুরুতে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দিয়েছিল। তাতে ওই মাসে পাঁচটি শৈত্যপ্রবাহের কথা বলা হয়, যার একটি তীব্র হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল — দেশ রূপান্তর ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে।
ইত্তেফাকের ১৪ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেবার ৬ থেকে ১৪ জানুয়ারি টানা নয় দিন তেঁতুলিয়ায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়, আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ওঠানামা করে ৬ দশমিক ৮ থেকে ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।
সংখ্যার হিসাব
দেশের রেকর্ড সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও তেঁতুলিয়ার: ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি সেখানে পারদ নেমেছিল ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে — বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ২০২৪ সালের ২৮ জানুয়ারি এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: দেশ রূপান্তর, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬; ইত্তেফাক, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৪
