
দীর্ঘ রাত, ছোট দিন: শীতকে ইবাদতের মৌসুম বানানোর প্রস্তুতি
ছবিঃ সংগৃহীত
কুয়াশাঢাকা সকাল, হিমেল বাতাস আর লম্বা রাত, শীতকাল প্রকৃতিতে আনে আলাদা আবহ। কারও কাছে এ ঋতু আরামের, কারও কাছে আনন্দের। একজন মুমিনের জন্য অবশ্য শীত ইবাদত-বন্দেগিতে মন দেওয়ার বিশেষ সুযোগ। একটু পরিকল্পনা আর আন্তরিক চেষ্টা থাকলে শীতের প্রতিটি দিনই হয়ে উঠতে পারে আখিরাতের পাথেয় জমানোর অনন্য সুযোগ।
শীতের বড় বৈশিষ্ট্য তার দীর্ঘ রাত। দিনের ব্যস্ততা শেষে রাতের নির্জনতায় আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো মুমিনের আত্মিক প্রশান্তির অন্যতম উপায়। লম্বা রাত তাহাজ্জুদ নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর রাতের একাংশে তাঁর উদ্দেশে সিজদাবনত হও এবং দীর্ঘ রাত ধরে তাঁর তাসবিহ পাঠ করো।’ (সুরা ইনসান: ২৬)
রাতের ইবাদত অন্তরকে দুনিয়াবি পঙ্কিলতা থেকে পরিশুদ্ধ করে, আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক আরও গভীর করে। শেষরাতে তাহাজ্জুদ, অতীতের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণে দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত তৈরি হয়। তাই শীতের দীর্ঘ রাত যেন অলসতা বা অপ্রয়োজনীয় কাজে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে প্রত্যেক মুমিনের বিশেষ সচেতন থাকা দরকার।
ঠান্ডা পানিতে অজু করা শীতে অনেকের জন্য বেশ কষ্টের, বিশেষ করে ফজরের হিম ভোরে অনেকে তীব্র শীত অনুভব করেন। অথচ শরিয়তের বিধান অনুযায়ী এই প্রতিকূলতার মধ্যেও পরিপূর্ণভাবে অজু করার রয়েছে বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদা।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন কাজের কথা জানাব না, যার মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহসমূহ মুছে দেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন?’ সাহাবিরা বললেন, ‘অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল!’ তিনি বললেন, ‘কষ্টের সময় পূর্ণাঙ্গভাবে অজু করা, মসজিদের দিকে বেশি বেশি পদচারণ করা এবং এক নামাজের পর পরবর্তী নামাজের জন্য অপেক্ষা করা।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫১)
হাদিসটি থেকে স্পষ্ট, কষ্টের মধ্যেও ইবাদতে যত্নবান থাকার প্রতিদান আল্লাহর কাছে অনেক বেশি। তবে তীব্র ঠান্ডা বা অসুস্থতায় শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে ইসলাম বিকল্প বা সহজ বিধান, যেমন হালকা গরম পানি ব্যবহার বা তায়াম্মুম গ্রহণের সুযোগ রেখেছে। কারণ, ইসলাম সাধ্যের বাইরে কোনো বোঝা মানুষের ওপর চাপায় না।
শীতের দিন তুলনামূলক ছোট, রাত আরামদায়ক। ছোট এই দিনগুলো নফল রোজার জন্য অনুকূল; দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ক্লান্তি ছাড়াই সহজে রোজা রাখা যায়।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘ধৈর্যের মাস হলো রমজান মাস। আর প্রত্যেক মাসে তিন দিন সাওম (রোজা) পালন করা সারা বছর সাওম পালন করার সমতুল্য।’ (সুনানে নাসায়ি: ২৪০৮)
মাসে তিন দিন রোজা রাখলে মনের নানা ওয়াসওয়াসা ও কুপ্রবৃত্তিও দূর হয়। প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের অন্তরের ওয়াসওয়াসা দূর করার আমল সম্পর্কে অবহিত করব না? তা হলো প্রত্যেক মাসে তিন দিন রোজা পালন করা।’ (সুনানে নাসায়ি: ২৩৮৬)। শীতের ছোট দিনে এই সুন্নত আমল সহজেই রুটিনে যোগ করা যায়।
শীতের সৌন্দর্য আর আমেজ সবার জীবনে সমান আনন্দ আনে না। ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল বা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো ছিন্নমূল মানুষের কাছে শীত এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। বিশেষ করে দরিদ্র, অসহায়, এতিম ও বয়স্কদের জন্য শীত আসে বাড়তি দুর্ভোগ আর কষ্ট নিয়ে। এ সময় সামর্থ্যবানদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সাধ্যমতো শীতবস্ত্র বিতরণ এবং প্রয়োজনীয় খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকটপ্রতিবেশী ও দূরপ্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা নিসা: ৩৬)
এই আয়াত মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার চিরন্তন শিক্ষা দেয়। তাই শীতার্ত মানুষের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসা কেবল সাধারণ সামাজিক কাজ নয়, ইসলামের অন্যতম মহান মানবিক শিক্ষা ও ইবাদতেরও অংশ।
সব মিলিয়ে শীতকাল একজন মুমিনের জন্য নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার অনন্য উপলক্ষ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শীতকালকে ইবাদতময় ও বরকতময় করে তোলার তাওফিক দান করুন।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
