
পটাশিয়ামযুক্ত লবণে বছরে ৩০ লাখ মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব, বলছে জর্জ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ
ছবিঃ সংগৃহীত
সাধারণ খাবার লবণের বদলে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ বিকল্প লবণ ব্যবহার করলে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। হৃদ্রোগ ও কিডনি রোগের এক কোটি নতুন ঘটনাও প্রতিরোধ করা যেতে পারে। নতুন এক বিশ্লেষণ বলছে, এই স্বাস্থ্যকর লবণে উচ্চ রক্তচাপসহ নানা প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের খবরে বলা হয়েছে, জর্জ ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের ওই বিশ্লেষণ অনুযায়ী বিকল্প এই লবণ দেখতে ও স্বাদে সাধারণ লবণের মতোই, তবে এতে যুক্ত থাকে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ উপাদান। পটাশিয়াম একটি অত্যাবশ্যকীয় খনিজ; এটি উচ্চ রক্তচাপ কমাতে, হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতে এবং প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে ক্যালসিয়াম বেরিয়ে যাওয়া কমাতে সাহায্য করে। এতে কিডনিতে পাথরের ঝুঁকিও কমে। অনলাইন ও বিভিন্ন দোকানে সহজে পাওয়া যায় এমন এই লবণের দাম ৬ থেকে ২০ ডলার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত বছর এই বিকল্প লবণ ব্যবহারের পক্ষে সুপারিশ করেছিল।
প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ব্রুস নিলের মতে, বেশি সোডিয়াম খাওয়া আর যথেষ্ট পটাশিয়াম না খাওয়া উচ্চ রক্তচাপের সুপ্রতিষ্ঠিত কারণ। উচ্চ রক্তচাপ আবার স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও কিডনি রোগের মতো প্রাণঘাতী অসুস্থতার অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। তিনি বলেন, পটাশিয়ামসমৃদ্ধ লবণ ব্যবহার করলে খাদ্যাভ্যাসের এই দুই সমস্যাই একসঙ্গে মোকাবিলা করা যায়, যা স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান কারণ হৃদ্রোগ ও রক্তনালিসংক্রান্ত রোগ, যাতে প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি মানুষ মারা যান। কিডনি রোগে বছরে মৃত্যু হয় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের। বিশ্বজুড়ে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি তিনজনে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত; সব মিলিয়ে এই সংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সেখানকার মানুষ চিকিৎসকদের সুপারিশের চেয়ে প্রতিদিন অনেক বেশি সোডিয়াম গ্রহণ করেন। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশটির প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। ব্রুস নিল মনে করেন, এসব রোগের ঝুঁকি ও মৃত্যু কমাতে ব্যাপক পরিবর্তন দরকার, বিশেষ করে খাদ্যশিল্পে। তাঁর হিসাবে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় মানুষের মোট লবণ গ্রহণের ৭০ শতাংশের বেশি আসে প্রক্রিয়াজাত খাবার ও রেস্তোরাঁর খাবার থেকে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বের ১৯৩টি দেশে সাধারণ লবণের জায়গায় পুরোপুরি পটাশিয়ামসমৃদ্ধ বিকল্প লবণ ব্যবহার করা হলে এক লাখ চার হাজারের বেশি মৃত্যু এবং হৃদ্রোগ ও কিডনি রোগের প্রায় পাঁচ লাখ ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। শুধু উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তরা এই লবণে বদলালেও হৃদ্রোগ ও কিডনি রোগের ১০ লাখের বেশি ঘটনা ঠেকানো যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ব্রুস নিল বলেন, বিশ্বজুড়ে সাধারণ লবণের জায়গায় পটাশিয়ামসমৃদ্ধ লবণ চালু করা উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হলেও এটি কার্যকর সূচনা হতে পারে, যা দেশগুলোকে এই উদ্যোগের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবার সুযোগ দেবে। তাঁর মতে, অনেক ওষুধনির্ভর চিকিৎসার তুলনায় এর সম্ভাব্য সুফল অনেক বেশি, খরচও অনেক কম।
তবে বিকল্প লবণের কিছু ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। উন্নত পর্যায়ের কিডনি রোগীদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি থাকার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ ক্ষতিগ্রস্ত কিডনি রক্ত থেকে বাড়তি পটাশিয়াম ছেঁকে বের করার স্বাভাবিক সক্ষমতা হারায়।
রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলে ‘হাইপারক্যালেমিয়া’। গুরুতর জটিলতা দেখা দেওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক সময় এর কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না, তবে অবস্থা গুরুতর হলে হার্ট অ্যাটাক ও সাময়িক পক্ষাঘাতের মতো জটিলতা হতে পারে। তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির দাবি, উন্নত পর্যায়ের কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রেও বিকল্প লবণের সম্ভাব্য উপকার ঝুঁকির চেয়ে বেশি।
প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ও কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ বিবেক ঝা বলেন, গুরুতর কিডনি রোগী এবং রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয় এমন ওষুধ যাঁরা খান, তাঁদের বিশেষ সতর্ক থাকা দরকার।
তাঁর মতে, রোগীদের যথাযথ সচেতনতা, পণ্যের গায়ে সতর্কতামূলক তথ্য এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা গেলে এই ঝুঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এক নজরে
বিজনেস টুডের ২৯ জানুয়ারি ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডব্লিউএইচওর ওই নির্দেশিকা সাধারণ খাবার লবণের বদলে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ কম-সোডিয়ামের লবণ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত একটি পরীক্ষায় তিন মাস এমন লবণ ব্যবহারে সিস্টোলিক রক্তচাপ ৪ দশমিক ৬ এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ১ দশমিক ১ মিলিমিটার পারদ কমেছিল।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: বিজনেস টুডে, ২৯ জানুয়ারি ২০২৫
