প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ: প্রকল্প নয়, চাই জাতীয় কর্মসূচি ও সমন্বিত বাস্তবায়ন
ছবিঃ সংগৃহীত
‘গোল্ডেন ডেজ’ বা সোনালি দিন—এ নামেই পরিচিত জন্ম-পরবর্তী প্রথম এক হাজার দিন। পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষার মধ্য দিয়ে এ সময়েই গড়ে ওঠে শিশুর বিকাশের ভিত্তি। জন্মের পর প্রথম আট বছর শিশুর বিকাশের জন্য সঠিক পুষ্টি ও যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা নিতে আসা মায়েদের প্রয়োজনীয় খাদ্য, সেবা ও নিরাপদ প্রসব নিয়ে এ সময়ে পরামর্শ দেওয়াও খুবই জরুরি।
অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের কাছে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে হবে। এর গুরুত্ব কী, আর কোন কোন বিষয় শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে এসব তথ্যও।
শূন্য থেকে আট বছর—বাংলাদেশে এই বয়সের মধ্যেই শিশুর মস্তিষ্কের দ্রুত প্রারম্ভিক বিকাশ ঘটে। এ সময়ে করা বিনিয়োগ ভবিষ্যতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একটি টেকসই সমাজ গড়তে চাইলে শুরু করতে হবে শিশুদের দিয়েই, কারণ তারাই জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের যথাযথ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব কেবল পরিবারের নয়, সবার। ভাগাভাগি, যত্ন ও সহমর্মিতার মূল্যবোধ শিশুদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে।
অথচ অনেক সময় আমরা ভুল খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলি, ছোট শিশুকে পরিচয় করিয়ে দিই অস্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে। এসব ব্যাপারে সচেতন করতে হবে পরিবারকে। প্রারম্ভিক শিশু বিকাশকে (ইসিডি) দেখতে হবে সমন্বিতভাবে। শিশুর বিকাশ চাইলে আগে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে; আর শিশুকে ভালো রাখতে হলে ভালো রাখতে হবে মাকেও।
প্রতিটি শিশুর বেঁচে থাকা, সুরক্ষা, যত্ন, বিকাশ ও শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেওয়া, যা ভ্রূণ অবস্থা থেকে শিশুর কাঙ্ক্ষিত বিকাশ নিশ্চিত করবে—সেটিই শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ। বাংলাদেশে শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের (ইসিসিডি) সমন্বিত নীতি-২০১৩-তে বিষয়টি এভাবেই বলা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, কার্যক্রমটি বাস্তবায়নে নানাভাবে সম্পৃক্ত থাকবে মোট ১৫টি মন্ত্রণালয়। সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে এক হয়ে এগুলো বাস্তবায়নে কিছুটা এগোনো সম্ভব হয়েছে। তবে নীতিগুলো পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে শক্ত নেতৃত্ব ও অঙ্গীকার দরকার, আর তা আসতে হবে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকেই।
এই খাতকে গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের সমন্বিত নীতি-২০১৩ এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর পাশাপাশি রয়েছে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা, প্যারেন্টিং ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের বিভিন্ন কর্মসূচি।
প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ-সংক্রান্ত কার্যক্রম নির্ভর করে উন্নয়ন প্রকল্প বা ডেভেলপমেন্ট বাজেটের ওপর। এসব সেবা ধীরে ধীরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব বাজেটের আওতায় এনে সরকারি নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে গ্রহণ করা গেলে সেগুলো টেকসইভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ অনেক বেড়ে যাবে।
নতুন কিছু যুক্ত করার বেলাতেও বাস্তবসম্মতভাবে ভাবা দরকার। প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের সেবাগুলো বিদ্যমান দায়িত্ব ও সেবাকাঠামোর ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যেমন প্যারেন্টিং সাপোর্ট, প্রাথমিক উদ্দীপনা বা শিশু বিকাশ-সংক্রান্ত বার্তাগুলোকে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা বা কমিউনিটি পর্যায়ের সেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে আলাদা নতুন কোনো কাঠামো তৈরি ছাড়াই তা অনেক বেশি কার্যকরভাবে ও বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষণা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নীতিনির্ধারণ—এ তিন দৃষ্টিভঙ্গিকে সমন্বিত করা গেলে তা বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়ক হবে, যাতে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়।
প্রকল্পভিত্তিক কাজ থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় কর্মসূচিতে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইউনিসেফের এডুকেশন ম্যানেজার মো. ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, স্থায়ী বাজেটের ভেতরে ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে সব শিশুকে। উদ্যোগটি বহু খাতভিত্তিক, তাই সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। স্থানীয় সরকারকেও এ ক্ষেত্রে যুক্ত করতে হবে।
তাঁর ভাষ্য, দেশে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক, তাদের সদিচ্ছা ও সক্ষমতাও আছে। তবে কার্যক্রম না থাকলে প্রশিক্ষণ কাজে আসে না। সে কারণে স্পষ্ট কর্মসূচি, নেতৃত্ব ও জবাবদিহির বিকল্প নেই। নিশ্চিত করতে হবে প্রয়োজনীয় শিশু অধিদপ্তর গঠন, জাতীয় কারিগরি ও সমন্বয় কমিটির নিয়মিত বৈঠক এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফোকাস করতে চাই—নীতি, তার বাস্তবায়ন এবং অগ্রাধিকার। ২০১৩ সালে দেশে একটি সমন্বিত ইসিডি নীতি অনুমোদিত হয়েছে। আজ ১৪ বছর পরও আমরা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। এই নীতিতে ১৫টি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নির্ধারিত। জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সমন্বয় কাঠামো আছে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জবাবদিহির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। এরপরও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।’
বড় সমস্যা কোথায়, সে প্রসঙ্গে তাঁর মত হলো, প্রারম্ভিক শিশু বিকাশকে আমরা নীতি হিসেবে নয়, একটি প্রোগ্রাম হিসেবে দেখি। স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নের পূর্ণ দায় যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের, শিক্ষানীতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমনই। অথচ প্রারম্ভিক শিশু বিকাশে নেতৃত্ব কে দেবে আর সমন্বয় কে করবে—সে বোঝাপড়াই এখন পর্যন্ত দুর্বল।
তাঁর ভাষায়, ‘অথচ এটি একটি বহু খাতভিত্তিক নীতি, যেখানে সমন্বয়কারী সংস্থা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকা জরুরি। এই সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গত ১৩ বছরে অনেক ঘাটতি দেখা গেছে।’
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক ও বিভাগীয় প্রধান (ল্যাব) শ্যামল কুমার রায়ের বক্তব্য, ‘আমরা আগে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে কাজ করতাম, এখন সেটি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতায় এসেছে। এই ক্লিনিকগুলো গ্রামাঞ্চলে প্রতি ছয় হাজার মানুষের কাছে সেবা পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। মাঝখানে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও এখন আবার চালু হয়েছে।’
শ্যামল কুমার রায় বলেন, ‘নীতির দিক থেকে আমাদের অনেক কিছুই আছে, সংবিধানেও স্বাস্থ্য ও পুষ্টির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন নীতির চেয়ে আমাদের উচিত এখন থেকেই বিদ্যমান নীতিগুলো সমন্বয় ও কার্যকর করা।’
পুষ্টি খাতে কাজের অভিজ্ঞতায় তিনি প্রান্তিক মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব দেখেছেন। এই সেবা তাঁদের জন্য নয়—এমন ধারণা অনেকেরই। এটি যে তাঁদের অধিকার, তা তাঁদের জানাতে হবে।
তাঁর কথায়, ‘মাতৃসেবার শুরু প্রসব-পূর্ব সেবা (এএনসি) চেকআপ থেকে। সেখানে পুষ্টি, খাদ্যাভ্যাস, টিকা, শারীরিক পরিবর্তন, শিশু বিকাশ—সব বিষয়ে কাউন্সেলিং দেওয়া সম্ভব। এরপর নিরাপদ প্রসব, পোস্টনেটাল চেকআপ এবং শিশুর টিকাদান—সবই ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।’
প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ নিয়ে আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশু পুষ্টি বিভাগের বিজ্ঞানী ফাহমিদা তোফায়েলের বক্তব্য, ‘আমার দৃষ্টিতে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ একটি বহুমাত্রিক বিষয়। একক কোনো উপাদান দিয়ে এটিকে ব্যাখ্যা বা সমাধান করা যায় না। শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ পাঁচটি উপাদান দিয়ে বিষয়টি ধরার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাস্তবে আমাদের অনেক কর্মসূচি এই সব উপাদান পূরণ করতে পারে না। অর্থায়ন ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও এখানে কাজ করে।’
ফাহমিদা তোফায়েল আরও বলেন, ‘গর্ভকালীন সময়ের ওপর আমাদের বেশি জোর দিতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভধারণের শুরু থেকেই মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ ঘটে এবং জন্মের পর তিন বছর পর্যন্ত প্রতি সেকেন্ডে বিপুল সংযোগ তৈরি হয়। এখানে মায়ের প্রস্তুতির পাশাপাশি পুরো পরিবারের প্রস্তুতিও জরুরি।’
‘বিশেষ করে মাতৃকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি আমরা গবেষণায় গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছি। আমার মনে হয়, এটি প্রসব-পূর্ব সেবার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব, যা বাস্তবায়নের দিক থেকেও কার্যকর হতে পারে।’
বিদ্যমান অবকাঠামো—যেমন কমিউনিটি ক্লিনিক, পুষ্টি কর্মসূচি বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—এসবের ভেতর দিয়েই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা আলাদা নতুন কর্মসূচি নেওয়ার চেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত। সে জন্য অবশ্য কর্মসূচিগুলো হতে হবে সহজ, প্রশিক্ষণযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য। বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও এ ক্ষেত্রে জরুরি।