মেঘনার বুকে শিল্প স্থাপনের বিস্তার, নদীর প্রায় ২৪১ একর জমি দখলে
ছবিঃ সংগৃহীত
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দুই বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে সত্যতা পেয়েছে মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা সেই অভিযোগের, যা ছিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মেঘনা নদী দখল নিয়ে। গোটা বিষয় যাচাই-বাছাই শেষে ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
প্রতিবেদন বলছে, নদীর প্রায় ২৪১.২৭ একর জমি দখলে নিয়েছে মেঘনা গ্রুপের অধীন সাতটি প্রতিষ্ঠান। দখল করা এই জমির ৮৪.৭৭ একরে গড়ে তোলা হয়েছে স্থায়ী ভবন ও বিভিন্ন অবকাঠামো, আর রাস্তা নির্মাণে কাজে লাগানো হয়েছে ৫.৫ একর।
কমিটির সুপারিশ, দখল হওয়া জমি উদ্ধার করতে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড যেন জরুরি পদক্ষেপ নেয়। নদী রক্ষার ক্ষেত্রে গাফিলতি করা কর্তৃপক্ষগুলোর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে, এর ভিত্তিতে জেলা প্রশাসন পদক্ষেপ নেবে—এ তথ্য জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান ও নদী রক্ষা কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য মো. আলাউদ্দিন।
তদন্তের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের অক্টোবরে, তবে করোনা মহামারির কারণে কিছুদিন তা থেমে থাকে। পরে পিরোজপুর, হোসেনপুর ও বৈদ্যের বাজার ইউনিয়নের নানা এলাকায় গিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিনিধি দলটি।
নদীর জায়গা ভরাটের পর কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে ঝাউচর, আষাঢ়িয়ারচর, নরসুলদী, ছয়হিস্যা, টেঙ্গরচর, দুধঘাটা, দামোদরদী, সোনাউল্লাহ ও চর রমজান এলাকায়—প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে। ফ্রেশ সিমেন্ট, কেমিক্যাল কারখানা, ফ্রেশ সুগার, সুগার রিফাইনারি এবং মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলসসহ নানা স্থাপনা পরিদর্শন করেছে কমিটি।
উঠে এসেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক লাগোয়া মারাখালী নদী দখলের বিষয়টিও; নদীটির উত্তর ও দক্ষিণ পাড় থেকে ভেতরের দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত এই দখল। প্রতিবেদনে আরও তথ্য আছে যে নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে জেটি, সীমানাপ্রাচীর ও বহুতল অবকাঠামো।
কমিটি মনে করে, নদী এভাবে ভরাট করায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হয়ে পড়ছে; এতে সার্বিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও নিম্নাঞ্চলের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
এসব জমি সিএস রেকর্ডে নদীর নামে নথিভুক্ত ছিল, আর আরএস রেকর্ডে এর কিছু অংশ ছিল খাস জমি হিসেবে। তদন্ত দল এ প্রশ্নও তুলেছে যে সরকারি খাস জমি বন্দোবস্তের পর হাতবদল হওয়ার সময় সরকারের পাওনা অর্থ যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়েছিল কি না।
প্রতিবেদনে এ কথাও বলা হয়েছে যে বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন রয়েছে মেঘনা গ্রুপের কিছু জেটির, তবে দুটির লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্র আছে ঠিকই, কিন্তু নদীর জমি ও প্লাবনভূমিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়া এবং নদীতে তরল বর্জ্য ফেলার কারণে নদী ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকিতে পড়ছে।
কমিটি নদীটি রক্ষার জন্য মোট ১২টি সুপারিশ দিয়েছে। দ্রুত নদীর সীমানা চিহ্নিত করা, অবৈধ দখলদার ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো যাতে দায়িত্বশীল থাকে তা নিশ্চিত করা এসব সুপারিশের মধ্যে আছে।
ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে প্রতিবেদনটি প্রকাশ পাওয়ার পর। পরিবেশ বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সুপারিশ মেনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে নদী উদ্ধারের প্রক্রিয়াটি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, তাদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠক হয়েছে; মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সোনারগাঁওয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম অন্যদিকে জানান, মদিনা গ্রুপের দখলে থাকা নদী ও খাস জমি এরই মধ্যে উদ্ধার হয়েছে; তালিকা ধরে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল করা জমির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।