রিয়াদে হুতি হামলার ধাক্কা, প্রবাসী আয়ের বড় উৎস ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা
ছবিঃ সংগৃহীত
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও প্রবাসী পরিবারের জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংকটের মধ্যে অতি সম্প্রতি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হামলার ঘটনায় সেই লাইফলাইন ঘিরে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হামলাকেন্দ্রিক নিরাপত্তাঝুঁকি ও বিমান চলাচল স্থগিত হওয়ায় এরই মধ্যে সরাসরি ভোগান্তিতে পড়েছেন সৌদি আরবে কর্মরত প্রায় ৩৫ লাখ প্রবাসী এবং দেশটিতে যাতায়াতকারী ব্যক্তিরা। সংকটের দ্রুত অবসান না হলে একদিকে জনশক্তি রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
শীর্ষ উৎস দেশগুলোর রেমিট্যান্স প্রবাহের মাত্রা পর্যালোচনা করলেও এ উদ্বেগের যথেষ্ট যৌক্তিকতা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার আঁচ মেলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট প্রবাসী আয়ের ৪৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের ১৩ দেশ থেকে—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া ও তুরস্ক। এর মধ্যে শুধু উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) ছয় দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান থেকেই আসে মোট প্রবাসী আয়ের ৪৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের প্রবাসী আয়ের বড় একটি অংশ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে উঠেছে সৌদি আরব। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছে ৮৫৯ কোটি ডলার, যার মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ১৬৫ কোটি ডলার; অর্থাৎ মোট প্রবাসী আয়ের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশটি থেকে এসেছিল প্রায় ১২৩ কোটি ডলার, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সৌদি আরব থেকে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবাসীরা যেখানে ৭৫৮ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, সেখানে এককভাবে সৌদি আরব থেকে মিলেছে ৫৮৫ কোটি ডলার। এ বছরও সেই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলেও হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলা বন্ধ না হওয়া, নিরাপত্তাঝুঁকি দূর না হওয়া ও বিমান চলাচলে বাধা দীর্ঘ হলে এই মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটাতে পারে।
এই বাস্তবতায় প্রবাসী আয় বাড়ানোর তাৎক্ষণিক উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ রেখেছেন অর্থনীতিবিদেরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থায় রয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, যার বড় উৎস দেশ সৌদি আরব; সেখানে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে প্রবাসী আয় তথা দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বেই। পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এবং প্রবাসী আয়ের নতুন নতুন উৎস দেশের সন্ধানও করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
প্রবাসী আয় বাড়াতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠালে সরকার ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেয়, যা প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করছে।
গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশে প্রবাসী কার্ড চালুর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কার্ডে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে এবং আর্থিক লেনদেনও করা যাবে; বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে ৩ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু প্রণোদনা বাড়িয়ে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ধারা দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব নয়। বৈধ পথে অর্থ পাঠানো সহজ করা, বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং নতুন শ্রমবাজার তৈরি করাও জরুরি।