শুধু ডিজেলেই দিনে ১০৯ কোটি টাকা লোকসান সরকারের
ছবিঃ সংগৃহীত
শুধু ডিজেল খাতেই সরকারকে এখন প্রতিদিন প্রায় ১০৯ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে বর্তমানে ডিজেলের প্রতি লিটারে সরকারের লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। সে হিসাবে কেবল ডিজেলেই সরকারের বছরে লোকসান হবে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান আজ মঙ্গলবার দুপুরে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন। সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে ব্রিফিংটি হয়।
এ প্রেস ব্রিফিংয়ের উদ্দেশ্য ছিল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি ও সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে অবহিত করা।
উপদেষ্টা লিখিত বক্তব্যে জানান, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলেও দেশে তা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত, আর সে জন্য মেনে নিতে হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার লোকসান। তবে ধারাবাহিক এ লোকসান কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে জ্বালানি তেল পাচারের বড় ঝুঁকি এড়ানোর জন্য তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ বা সমন্বয় করতে হয়েছে সরকারকে।
নতুন নির্ধারিত দরে ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। একইভাবে অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা করা হয়েছে।
প্রতিবেশী ও এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম কেমন, তার তুলনা দিয়ে তথ্য উপদেষ্টা জানান, বর্তমানে ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ভারতের কলকাতায় ১৩৪.৭৬ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪.৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১.২৪ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯.৪২ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১.২২ টাকা এবং পাকিস্তানে ১৮৫.৪৮ টাকা।
দাম বাংলাদেশে সবচেয়ে কম হওয়ায় সীমান্ত পথে তেল পাচারের তীব্র ঝুঁকি দেখা দিয়েছিল, যে তেল কেনা হয় প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায়। লিটারে ২০ টাকা সমন্বয় করা হয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে; এতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর তিতাস-২৮ নম্বর কূপ উদ্বোধন করা হয়, যার মধ্য দিয়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরও ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ শুরু হয়েছে। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে এতে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়বে। আশা করা হচ্ছে, বিজিএফসিএলের আওতাধীন এলাকাগুলো থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করা সম্ভব হবে।
সামাজিক সুরক্ষা ও ফ্যামিলি কার্ড
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা কমাতে সরকার একাধিক বিকল্প সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করছে বলে জানান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, সারাদেশে প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের হাতে আগামী অক্টোবর থেকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তুলে দেওয়া হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে জিটুপি পদ্ধতিতে ভাতা সরাসরি চলে যাবে উপকারভোগীর বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। লক্ষ্য ধরা হয়েছে, ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে ১.৬১ কোটি পরিবারকে এ সর্বজনীন সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনা হবে।
চলমান রয়েছে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বিতরণ কার্যক্রমও; এর আওতায় দেশের ৫৫ লাখ পরিবার ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি করে চাল পাচ্ছে এবং ৩০০টি উপজেলায় দেওয়া হচ্ছে ভিটামিনসমৃদ্ধ ‘পুষ্টিচাল’।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য দিতে গিয়ে উপদেষ্টা জানান, আগস্ট মাসে সারাদেশে ২ হাজার ৯৪২টি খাদ্যনমুনা ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৮১১টিতে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর উপাদান মেলায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কমলো হজের বিমানভাড়া
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতির কথা জানাতে গিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ২০২৭ সালের হজের বিমানভাড়া ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ২৪ হাজার ৮৩০ টাকা কম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ভাড়া কমানো হয়েছে। ২০২৩ সালে এ ভাড়া ১ লাখ ৯৭ হাজার টাকারও বেশি ছিল।
পাশাপাশি সম্মানীর আওতায় আসছেন দেশের ৮৬ হাজার ৭০৯টি প্রতিষ্ঠানের ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ধর্মীয় নেতা ও সেবাকর্মী (ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবাইত ও বৌদ্ধ ভিক্ষু)। এ জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
ব্রিফিংয়ের সময় সেখানে ছিলেন তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মো. আলম মোস্তফা।