ছবিঃ সংগৃহীত
ভারতীয় অভিনেত্রী নীতি টেইলর জীবনের নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন—স্কুলে সহপাঠীদের বুলিং, চার বছরের প্রেমের সম্পর্কে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, আর সিনেমায় সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে এক পরিচালকের শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব। তাঁর অভিযোগ, সাবেক প্রেমিকের হাতে তিনি মারধরের শিকার হয়েছেন, শরীরে সইতে হয়েছে সিগারেটের ছ্যাঁকাও। সিনেমায় কাজের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে এক পরিচালক তাঁকে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেছেন এই অভিনেত্রী।
সম্প্রতি ‘হটারফ্লাই’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ‘ক্যায়সি ইয়ে ইয়ারিয়াঁ’, ‘গুলাম’ ও ‘বড়ে আচ্ছে লাগতে হ্যায়’-এর মতো টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয় করে পরিচিতি পাওয়া নীতি। স্কুলজীবনের হয়রানি, সম্পর্কের ভেতরের নির্যাতন, কাস্টিং কাউচ এবং শুটিং সেটে এক সহকর্মীর সঙ্গে বিরোধের অভিজ্ঞতাও সেখানে উঠে আসে।
স্কুলজীবনকে নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন নীতি। তাঁর ভাষ্যমতে, বান্ধবীদের প্রেমিকদের প্রতি আগ্রহ না দেখানোর পর কয়েকজন ছেলে তাঁকে বার্তা পাঠাতে থাকেন। তাঁর ধারণা, প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারেননি তাঁদের কেউ কেউ, আর এরপর থেকেই তাঁকে ঘিরে অপমান ও হয়রানির শুরু।
নীতি জানান, স্কুলের শৌচাগার, বাসস্টপসহ নানা জায়গায় তাঁর বাড়ির ফোন নম্বর লিখে রাখা হতো, ফলে বাড়ির ল্যান্ডফোনে আসতে থাকত আপত্তিকর কল। কয়েকজন সহপাঠী তাঁকে উদ্দেশ করে অশালীন মন্তব্য করত, তাঁর গায়ে পানি ও খাবার ছুড়ে মারত, বিভিন্ন জায়গায় কুরুচিপূর্ণ কথাও লিখে রাখত।
এসব ঘটনা তাঁর ওপর কতটা গভীর ছাপ ফেলেছিল, তা বোঝাতে নীতি বলেন, স্কুলবাসে বসে প্রায় প্রতিদিনই কাঁদতেন তিনি। পরে বিষয়টি বাবা-মাকে জানালে তাঁরা পরীক্ষায় মন দিতে বলেন এবং পরীক্ষা শেষ হলে শহর ছেড়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন।
অভিনেত্রী জানান, ‘ক্যায়সি ইয়ে ইয়ারিয়াঁ’র প্রথম মৌসুমের শুটিং চলাকালে তিনি নির্যাতনমূলক এক প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর অভিযোগ, তাঁর পোশাক, চলাফেরা আর অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা নিয়ে সাবেক প্রেমিক প্রায়ই আপত্তি তুলতেন। একবার প্রেমিকের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অস্বস্তি লাগায় বান্ধবীদের সঙ্গে চলে যেতে চাইলে প্রেমিক তাঁকে বাধা দেন।
নীতির ভাষ্য, এরপর বাড়ির বাইরে দুজনের মধ্যে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়। তাঁর অভিযোগ, প্রেমিক তাঁকে ধাক্কা দেন, চড়ও মারেন। পুরো ঘটনা ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছিল বলেও দাবি তাঁর।
মারধরের পাশাপাশি ওই সম্পর্কে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন নীতি। তিনি জানান, সেই ক্ষতচিহ্ন এখনো তাঁর শরীরে আছে; ত্বকে সহজে কেলয়েড তৈরি হয় বলে দাগটি স্পষ্ট বোঝা যায়।
শারীরিক নির্যাতনের সঙ্গে নিয়মিত অপমানজনক মন্তব্যও শুনতে হতো বলে জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। নীতির দাবি, সাবেক প্রেমিক তাঁকে খাটো, মোটা ও দেখতে খারাপ বলে কটাক্ষ করতেন, যার ফলে নিজের চেহারা ও যোগ্যতা নিয়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রেমিকের জন্য অনেক কিছুই করতেন বলে জানান নীতি—তাঁর ঘর পরিষ্কার করা, রান্না করা, এমনকি প্রেমিকের বাবা-মা বেড়াতে এলে তাঁদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বও নিতেন। চার বছর পর সম্পর্কটি থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি উপলব্ধি করেন, দীর্ঘ সময়ের নির্যাতন তাঁর আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
নীতি বলেন, এখনো কেউ তাঁর সৌন্দর্যের প্রশংসা করলে সেটি বিশ্বাস করা তাঁর জন্য কঠিন। তাঁর মতে, বড় হওয়ার সময় থেকেই নিজের মূল্য বুঝতে শেখা দরকার, আর অন্য কাউকে নিজের আত্মসম্মান নষ্ট করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাজের সময় কাস্টিং কাউচের অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন নীতি। তাঁর অভিযোগ, দুটি সিনেমায় অভিনয়ের পর প্রথম ছবির পরিচালক তাঁকে নতুন একটি ছবিতে কাজের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাঁকে জানানো হয়, চরিত্রটি পেতে হলে পরিচালকের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে হবে।
এমন প্রস্তাব শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান নীতি। তিনি জানান, ফোন কেটে দিয়ে পরিচালকের নম্বর ব্লক করেন এবং মাকে পুরো বিষয়টি জানান। ঘটনাটি তাঁকে মানসিকভাবে এতটাই আঘাত করে যে এরপর সিনেমায় আর কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।
‘গুলাম’ ধারাবাহিকের সময় এক সহশিল্পীর সঙ্গে বিরোধের প্রসঙ্গও সাক্ষাৎকারে টানেন নীতি। তাঁর ধারণা, ধারাবাহিকে তিনি যে মনোযোগ পাচ্ছিলেন, সেটি ওই সহশিল্পী ভালো চোখে দেখেননি। নীতি জানান, দুজনই একই মেকআপশিল্পীর কাছে সাজতেন, কিন্তু মেকআপশিল্পী যাতে তাঁর কাছে যেতে না পারেন, সে জন্য ওই সহশিল্পী দরজা বন্ধ করে রাখতেন। একবার মেকআপশিল্পীকে নিজের ঘরে আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছিল বলে অভিযোগ তাঁর।
শুটিং সেটে তাঁর আচরণ নিয়ে প্রকাশিত নেতিবাচক প্রতিবেদন নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন নীতি। তাঁর ভাষ্য, সেসব প্রতিবেদনে সেটে দেরিতে আসা এবং উদ্ধত আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে তাঁর দাবি, সব সময় সময়মতো উপস্থিত থাকার চেষ্টা করতেন তিনি।
জীবনের নানা পর্বের এসব ঘটনা সামনে এনে নীতি বোঝাতে চেয়েছেন, দীর্ঘদিনের হয়রানি ও নির্যাতন একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস আর নিজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কতটা পাল্টে দিতে পারে। সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া।