ছবিঃ সংগৃহীত
মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্রাউডস্ট্রাইকের ধারণা, চীনের গুয়াংডং প্রদেশে অবস্থানরত ২৬ বছর বয়সী এক তরুণ দক্ষিণ কোরিয়ার একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি চালানো সাইবার হামলার পেছনে জড়িত থাকতে পারেন।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে প্রবেশ করতে হামলাকারী চীনে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক একটি সাইবার টুলের পাশাপাশি বিভিন্ন বড় ভাষা মডেল কাজে লাগিয়েছিলেন বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির। ওই ব্যক্তি কে, তা অবশ্য এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার আর্থিক খাতকে নিশানা করে সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরুর দিকে একের পর এক সাইবার হামলা হয় বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রাউডস্ট্রাইক জানিয়েছে, হামলাগুলোতে যে অবকাঠামো ব্যবহৃত হয়েছে তা এবং এআই কোডিং টুলের সেশন বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনের ব্যক্তিগত তথ্যের কিছু সূত্র তারা পেয়েছে।
চীনে তৈরি ওপেন-সোর্স এজেন্টিক পেনিট্রেশন টেস্টিং টুল এআরটিইএক্স এখন তদন্তকারীদের নজরে। টুলটির পাশাপাশি বড় ভাষা মডেলও ব্যবহৃত হয়েছে। ক্রাউডস্ট্রাইকের ভাষ্য, যে ধরনে হামলা হয়েছে, নির্দেশনা যেভাবে চীনা ভাষায় দেওয়া হয়েছে এবং যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, সেসব বিবেচনা করলে হামলাকারীর চীনা ভাষাভাষী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি তারা ‘মাঝারি মাত্রার আত্মবিশ্বাসে’ ধারণা করছে, আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে হামলাটি চালানো হয়ে থাকতে পারে।
এআরটিইএক্সের নেপথ্যে ডিপসিকের ভি৪.১-ফ্ল্যাশ মডেল কাজ করছিল—প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে এ তথ্যও উঠে এসেছে। ক্রাউডস্ট্রাইক পৃথক কয়েকটি সেশনে চীনের জিপু এআইয়ের জিএলএম-৫.৩ ও গ্রক ৪.৬ ব্যবহারের বিষয়টিও চিহ্নিত করেছে। এর অর্থ, শুধু একটি এআই ব্যবস্থার ওপর ভরসা না করে হামলাকারী একাধিক মডেল ও কোডিং পরিবেশ ব্যবহার করেছেন।
অ্যানথ্রপিকের ক্লড কোডের একটি সেশন থেকে সন্দেহভাজনের পরিচয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। ওই সেশনে একজন ব্যবহারকারী নিজের জন্য সাইবার নিরাপত্তা গবেষকের একটি জীবনবৃত্তান্ত বানিয়ে দিতে এআইকে বলেন। নির্দেশনাটিতে উল্লেখ ছিল বয়স ২৬ বছর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট এবং অবস্থান হিসেবে চীনের গুয়াংডংয়ের মাওমিং শহরের মতো তথ্য।
ক্রাউডস্ট্রাইকের তথ্য অনুযায়ী, টেলিগ্রামের একই ব্যবহারকারী-নাম আরও কিছু সাইবার কার্যক্রমে মিলেছে। সেগুলোর মধ্যে আছে টেলিগ্রামভিত্তিক একটি এনএফটি মার্কেটপ্লেসের নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে গবেষণা, আর আছে চীনের একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে সম্ভাব্য হামলার তথ্য। সূত্রগুলো থেকে বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে সন্দেহভাজনের যোগসূত্রের ইঙ্গিত মিললেও তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
কী উদ্দেশ্যে হামলা, সে বিষয়েও কয়েকটি সূত্র মিলেছে। ক্রাউডস্ট্রাইকের বিশ্লেষণ বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ার চুরি করা তথ্য কোন জায়গায় সাধারণত বিক্রি হয় এবং এ রকম তথ্য বিক্রির টেলিগ্রাম গ্রুপ খুঁজে পাওয়ার উপায় কী—ক্লডের কাছে এসব জানতে চেয়েছিলেন ওই ব্যক্তি। এর মধ্য দিয়ে হামলার নেপথ্যে আর্থিক উদ্দেশ্য থাকার সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি ঘটা তথ্য ফাঁসের ঘটনা তদন্ত করছে। সেই তদন্তে শিনহান ব্যাংক, কেবি কুকমিন ব্যাংক, হানা ব্যাংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। ক্রাউডস্ট্রাইক তাদের বিশ্লেষণে যে হামলাগুলোর উল্লেখ করেছে, সেগুলোর মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য আছে একটি ব্যাংকের ঋণ-সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধান সেবা এবং অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মোবাইল ওয়ার্ক-সাপোর্ট ব্যবস্থার।
হামলাকারী হংকংভিত্তিক একটি সার্ভার মূল নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো হিসেবে কাজে লাগিয়েছিলেন বলে ইয়োনহাপের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এআরটিইএক্স চলছিল অন্য একটি সার্ভারে; ধারণা করা হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করার কাজে সেটি ব্যবহৃত হয়েছে। হামলার গতিপথ গোপন রাখার চেষ্টাও চলেছিল, এ জন্য ব্যবহার করা হয় একাধিক আইপি ঠিকানা।
এ ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বড় হয়ে ওঠার কারণ—এআইকে এবার শুধু লেখালেখি কিংবা কোড তৈরিতে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি; সাইবার আক্রমণের নানা ধাপে এআই-চালিত এজেন্ট কাজে লাগানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। ক্রাউডস্ট্রাইকের ভাষ্য, এমন প্রযুক্তির সাহায্যে একজন হামলাকারী স্বল্প সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করতে পারছেন। প্রতিষ্ঠানটির আশঙ্কা, সাইবার অপরাধীরা ভবিষ্যতে এআইয়ের ব্যবহার আরও বাড়াবে।
সাম্প্রতিক ব্যাংক হ্যাকিংয়ের কয়েকটি ঘটনায় এআই ব্যবহারের আলামত মিলেছে—এমন কথা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংও বলেছিলেন। তিনি দেশটির সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
অবশ্য তদন্ত এখনো রয়েছে প্রাথমিক স্তরে। কে হামলার সঙ্গে যুক্ত, সব মিলিয়ে কতটি প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত এবং চুরি হওয়া তথ্যের পরিমাণ কত—এসব প্রশ্নে চূড়ান্ত তথ্য এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে হামলার নেপথ্যের ব্যক্তি ২৬ বছর বয়সী ওই তরুণই, এমন সিদ্ধান্তে আসার সময় এখনো হয়নি।
এরপরও ঘটনাটিতে একটি নতুন বাস্তবতা পরিষ্কার হয়ে উঠছে—এআই এজেন্ট এখন ব্যাংক হ্যাকিংয়ের মতো জটিল সাইবার অপরাধেও বাস্তব অপারেশনাল হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ শুধু দক্ষ হ্যাকার ঠেকানো নয়; এআই-চালিত দ্রুতগতির ও স্বয়ংক্রিয় আক্রমণ প্রতিহত করাও সেই চ্যালেঞ্জের অংশ।