
বছরে ২৭ লাখ টন সার উৎপাদনের লক্ষ্য: ভোলা, চট্টগ্রাম ও পলাশে নতুন তিন কারখানার পরিকল্পনা
ছবিঃ সংগৃহীত
সার উৎপাদন বাড়াতে নতুন তিনটি কারখানা গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর একটি হবে ভোলায়, দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনক্ষমতার। চট্টগ্রামে বছরে ৪ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি এবং নরসিংদীর পলাশে বছরে ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) উৎপাদনক্ষমতার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগও রয়েছে।
পরিকল্পনাটি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি)। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে দেশে সার উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমা, কৃষি খাতে সরবরাহ জোরদার এবং শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে তোলার লক্ষ্য ঠিক করেছে সংস্থাটি।
বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির অধীনে মোট সাতটি সার কারখানা আছে, যার পাঁচটি ইউরিয়া ও দুটি নন-ইউরিয়া। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়ার চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। ওই অর্থবছরে বিসিআইসির কারখানাগুলোতে উৎপাদিত হয়েছে ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, যা মোট চাহিদার ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
একই অর্থবছরে টিএসপির চাহিদা ছিল সাত লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন, ডিএপির ১৪ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। বিপরীতে বিসিআইসির কারখানায় উৎপাদন হয়েছে যথাক্রমে ৬৮ হাজার ২৫৯ ও ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন, যা মোট চাহিদার ৯.১০ শতাংশ ও ৫.৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ চাহিদার অধিকাংশই মেটানো হচ্ছে আমদানি করে।
বিসিআইসির কর্মকর্তারা জানান, সরকার প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়ায় ২৩ হাজার টাকা, টিএসপিতে ৪৯ হাজার ১৭০ টাকা এবং ডিএপিতে ৯৮ হাজার ৮৪০ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। এসব বিবেচনায় নিয়েই নতুন তিনটি কারখানার সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি বিদ্যমান কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ও আধুনিকায়নেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ টন ইউরিয়া
ইউরিয়ার চাহিদা মেটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই ভোলায় নতুন কারখানার পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত কারখানাটির লক্ষ্যমাত্রা দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া।
বিসিআইসির হিসাবে, কারখানাটি চালু রাখতে দৈনিক ৪৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস লাগবে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কারখানাটি হলে দেশের ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে, আর কৃষকের চাহিদামতো সার সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের অবদান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ বিষয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, ‘দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ভোলায় প্রস্তাবিত ইউরিয়া সার কারখানা নির্মাণের কাজ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ, কারিগরি প্রস্তুতি, অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।’
চট্টগ্রামে বছরে ৪ লাখ টন টিএসপি
ফসফেটজাত সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় টিএসপিসিএল কমপ্লেক্সের অব্যবহৃত জমিতে বছরে ৪ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষমতার নতুন টিএসপি কারখানা করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিসিআইসির টিএসপি কমপ্লেক্সে এখন কাঁচামালের সংকট আর প্ল্যান্টের সমস্যায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন কারখানা হলে টিএসপি উৎপাদনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, ‘টিএসপি সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিকগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে টিএসপি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং দেশের সার সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের অবদান বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।’
পলাশে ইউএফ-৮৫ কারখানা
নরসিংদীর পলাশে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসির অব্যবহৃত জায়গায় বছরে ২৪ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষমতার ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) কারখানা করার পরিকল্পনা আছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো ও অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানো যাবে, সংশ্লিষ্ট শিল্পপণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, ‘বিদ্যমান শিল্প প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। পলাশে প্রস্তাবিত ইউএফ-৮৫ কারখানার ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রযুক্তি, বাজার চাহিদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
নতুন তিন কারখানার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্মাণপর্বে এবং উৎপাদন শুরুর পর বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থান হতে পারে। প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ শ্রমিক ও পরিচালনাকর্মীর পাশাপাশি পরিবহন, সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সেবা খাতে পরোক্ষ কর্মসংস্থানেরও সম্ভাবনা আছে। ভোলা, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ওই সব এলাকায় বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়ানো এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, ‘নতুন কারখানা স্থাপনের ফলে নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে কতজনের কর্মসংস্থান হবে, তা প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা, উৎপাদন প্রযুক্তি ও জনবল কাঠামো নির্ধারণের পর বলা সম্ভব হবে। আমরা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প খাতে দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চাই।’
সংখ্যার হিসাব
রাইজিংবিডির ১৩ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সৌদি আরবের সাবিক এগ্রি নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানির সঙ্গে মোট ৬ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া আমদানির চুক্তি করা হয়। এর মধ্যে ৩ লাখ মেট্রিক টন রাখা হয় আপৎকালীন পরিস্থিতি ও দেশীয় কারখানার উৎপাদন ঘাটতি মোকাবিলার জন্য।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সেদিন অনুমোদন পাওয়া ৪০ হাজার মেট্রিক টনের চালানে প্রতি টন ইউরিয়ার দাম ধরা হয়েছিল ৩৯০ মার্কিন ডলার।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: রাইজিংবিডি, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
