
চীন বিশ্বস্ত বন্ধু ও কৌশলগত অংশীদার: বঙ্গভবনে চীনা মন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি
ছবিঃ সংগৃহীত
চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং আজ তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এ আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম বাসসকে এ কথা জানিয়েছেন।
মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সই এবং চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।’
কুনমিং ও চট্টগ্রামকে যুক্ত করার প্রস্তাবিত করিডর এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরসহ বহুমাত্রিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবকে স্বাগত জানান তিনি।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে রাষ্ট্রপতি এ সময় ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান এবং সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
বাংলাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের ওপর জোর দেন রাষ্ট্রপতি, বিশেষ করে প্রযুক্তি হস্তান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়ক খাতগুলোতে।
চীনের মন্ত্রী তখন সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ নানা বিষয়ে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন।
এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতালের অর্থায়ন ও নির্মাণে সহায়তার জন্য চীনকে ধন্যবাদ জানান রাষ্ট্রপতি। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে চীনের সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত থাকবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।
এ বিষয়ে চীনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দেন চীনা মন্ত্রী।
চলমান জ্বালানি সংকটে চীনের অব্যাহত সহযোগিতার জন্যও ধন্যবাদ জানান রাষ্ট্রপতি।
১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চীন সফরের কথা গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঐতিহাসিক ওই সফরগুলোই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত গড়ে দিয়েছিল।
লিউ হাইশিং বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়েই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। পরে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে এ সম্পর্ক আরও জোরদার হয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও বিস্তৃত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন চীনা মন্ত্রী।
চীনে নিজের সর্বশেষ সফরের প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতি বলেন, চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সফররত মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকগুলো ফলপ্রসূ হয়েছিল এবং পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সফরটি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংসহ দেশটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময় এবং সফরে সমঝোতা স্মারকসহ বিভিন্ন সহযোগিতা-সংক্রান্ত দলিল সইকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
সাক্ষাৎকালে লিউ হাইশিংয়ের অব্যাহত সাফল্য ও সুস্বাস্থ্য কামনা করেন রাষ্ট্রপতি।
এর আগে মন্ত্রী লিউ হাইশিং বঙ্গভবনে পৌঁছালে রাষ্ট্রপতি তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ফুল দিয়ে বরণ করেন। এ সময় চীনের আন্তর্জাতিক মন্ত্রীর সঙ্গে নিজের সচিবদের পরিচয় করিয়ে দেন তিনি।
প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স লিউ ইউইন এবং সিপিসির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক পেং শিউবিন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব (সমন্বয়) সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী।
সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে চীনের আন্তর্জাতিক মন্ত্রী ও প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যদের বঙ্গভবন ঘুরিয়ে দেখান রাষ্ট্রপতি।
এ সময় দেখানো হয় চীনা মন্ত্রীর বাবা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত লিউ শুকিংয়ের একটি ভিডিওচিত্র—১৯৮০ সালে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাছে পরিচয়পত্র পেশের দৃশ্য। এলজিআরডি মন্ত্রী থাকার সময় রাষ্ট্রপতির চীন সফরের আলোকচিত্রও প্রদর্শন করা হয়।
রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, জন বিভাগের সচিব ও প্রেস সচিব এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রেক্ষাপট
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, মোংলা বন্দরে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে গত অক্টোবরে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৩৩ কোটি ৫৭ লাখ ৮০ হাজার ডলারের রেয়াতি ঋণচুক্তি সই হয় — কনটেইনার নিউজ ১৪ অক্টোবর এ তথ্য জানিয়েছে।
মেরিটাইম গেটওয়ের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪ হাজার ৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকার সংশোধিত প্রকল্পটি অনুমোদন পায়; মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা।
এক নজরে
প্রথম আলোর ২ আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন গড়ে তোলা হচ্ছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৭৮৩ একর জমিতে; সেখানে ১৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ আর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মিলিয়ে এক লাখের বেশি কর্মসংস্থানের আশা করা হচ্ছে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাসস
প্রেক্ষাপট সূত্র: কনটেইনার নিউজ, ১৪ অক্টোবর ২০২৬; মেরিটাইম গেটওয়ে, অক্টোবর ২০২৬; প্রথম আলো, ২ আগস্ট ২০২৬
