চীনের ব্লুবেরি বাজার ধরতে অর্থায়নের খোঁজে জিম্বাবুয়ের চাষিরা
ছবিঃ সংগৃহীত
চীনের সঙ্গে হওয়া নতুন বাণিজ্য চুক্তির ফলে যে বাজার এখন তাঁদের জন্য উন্মুক্ত, জিম্বাবুয়ের সেই রপ্তানি বাজারের জন্যই ব্লুবেরি তুলছিলেন কয়েকজন নারী। সকালের রোদে সারি সারি ঝোপের ফাঁকে তাঁদের হাত চলছিল দ্রুত।
ফরেস্টার এস্টেটস খামারটি রাজধানী হারারে থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে। চীনে চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগাতে খামারের ব্যবস্থাপকেরা আগামী বছর ব্লুবেরি আবাদের জমি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ৫০ হেক্টরে উন্নীত করতে চান। খবরটি জিম্বাবুয়ের মভুরউই থেকে দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
এএফপিকে খামারের ব্যবস্থাপক অ্যালবার্ট চাকালা বলেন, ‘অর্থায়নই সমস্যা।’ এক বছর আগে উদ্ভিদ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, আর মে মাসে ৫৩টি আফ্রিকান দেশ থেকে আমদানির ওপর শুল্ক তুলে নেয় চীন। এরপর গত জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে প্রথমবারের মতো চীনে ব্লুবেরি রপ্তানি করে।
চাকালার কথায়, ‘আমাদের যে উৎপাদন হচ্ছে, তা বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।’ তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্লুবেরি বাগান করতে হেক্টরপ্রতি শুরুতেই ৫০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার ডলার বিনিয়োগ করতে হয়; এ অর্থের প্রয়োজন পড়ে মূলত সেচ, চারা ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরিতে।
জিম্বাবুয়ের বহু কৃষক উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে যেসব বড় বাধার মুখে পড়ছেন, তার অন্যতম হলো সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ না থাকা। চাষি ও রপ্তানিকারকদের প্রতিনিধিত্ব করা হর্টিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল (এইচডিসি) এ কথা জানিয়েছে।
জিম্বাবুয়ের চলমান আর্থিক বাস্তবতা আর নতুন বৈশ্বিক বাজারের সম্ভাবনা—এ দুইয়ের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট থাকায় দেশটির কৃষকেরা চাহিদা মেটানোর মতো উৎপাদন বাড়ানোর জন্য দরকারি অর্থ প্রায়ই জোগাড় করে উঠতে পারেন না।
চাকালার ভাষায়, ‘আমরা ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ করছি। পণ্য বিক্রি করে যে অর্থ ফেরত পাচ্ছি, তার ভিত্তিতেই তা করছি।’
ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে জিম্বাবুয়ের ব্লুবেরি। তবে এখন বড় একটি নতুন বাজার হিসেবে সামনে এসেছে চীন, যে দেশটি বিশ্বে ব্লুবেরির অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা। স্বাস্থ্য উপকারিতার কারণে ফলটির ব্যাপক প্রচার রয়েছে। যেসব কৃষক চাষের পরিসর বাড়াতে সক্ষম, এ ফলের বাজার তাঁদের জন্য বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
অর্থায়ন নিয়ে ‘বড় উদ্বেগ’
মরক্কো ও দক্ষিণ আফ্রিকার পরই আফ্রিকায় ব্লুবেরি উৎপাদনে তৃতীয় বৃহত্তম দেশ জিম্বাবুয়ে—এ তথ্য এইচডিসির। দেশটি বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ব্লুবেরি উৎপাদক দেশগুলোরও অন্যতম।
চলতি বছর প্রায় ১২ হাজার টন ব্লুবেরি রপ্তানির আশা করছে খাতটি, যা আসবে প্রায় ৮৫০ হেক্টর জমি থেকে—জুনে এক বিবৃতিতে এ কথা জানান এইচডিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লিন্ডা নিলসেন। গত বছর উৎপাদন ছিল ৯ হাজার ৫০০ টন, জমির পরিমাণ ছিল ৬৫০ হেক্টর।
নিলসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন বাড়িয়ে চীনের বিপুল চাহিদার সুযোগ নিতে চায় খাতটি। এ জন্য আরও প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি অর্থায়ন এবং সেচ, সৌরবিদ্যুৎ ও শীতল সংরক্ষণব্যবস্থায় বিনিয়োগে নির্দিষ্ট কর-সুবিধার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে। তাঁর ভাষায়, ‘পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব চাষিদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।’
দেশটিতে বাণিজ্যিকভাবে যাঁরা ব্লুবেরি উৎপাদন করেন, তাঁদের বেশির ভাগই শ্বেতাঙ্গ কৃষক এবং তাঁদের পরিবার বহু বছর ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত বলে জানান জিম্বাবুয়ের এক্সপোর্ট প্রডিউস গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ক্ল্যারেন্স এমওয়ালে।
এএফপিকে তিনি বলেন, ‘চীনের মতো নতুন বাজার খুলে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকদেরও ব্লুবেরির মতো ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’ তবে তাঁর মতে, এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধন কম খরচে পাওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার।
এমওয়ালের ভাষ্য, ‘আমরা যদি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ, বিদেশি তহবিল, বিদেশি ঋণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন আনতে পারি, তাহলে নতুন কৃষকদের জন্য আরও ভালো সুযোগ তৈরির কথা বলা সম্ভব হবে।’ ব্যাংকঋণে সুদের হার যে চড়া, সে প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে স্থানীয়ভাবে অর্থ পাওয়া যায় ঠিকই, তবে তা খুব ব্যয়বহুল।’
আফ্রিকায় তামাক উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে জিম্বাবুয়ে। দেশটির প্রধান রপ্তানি কৃষিপণ্য হিসেবে কয়েক দশক ধরে জায়গা ধরে রেখেছে তামাকই। তামাক বোর্ডের হিসাবে, ২০২৫ সালে জিম্বাবুয়েতে তামাক উৎপাদিত হয়েছে ৩ লাখ ৫৫ হাজার টন। দেশটির বিপুল লিথিয়াম ও ক্রোমিয়াম আকরিকের ক্ষেত্রে যেমন, তামাকের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন।
তামাকের তুলনায় ব্লুবেরির উৎপাদন এখনো অনেক কম। এমওয়ালে অবশ্য মনে করেন, চীনের বিশাল বাজারের সম্ভাবনা নতুন প্রজন্মের কৃষকদের এ খাতের দিকে টানতে পারে। তাঁর কথায়, ‘আমার লক্ষ্য আরও বেশি তরুণকে ব্লুবেরি চাষে উৎসাহিত করা এবং তামাক চাষ থেকে তাঁদের সরিয়ে আনা। আমি মনে করি, এটি এমন একটি সুযোগ, যা কাজে লাগিয়ে তামাকের বদলে আমরা স্বাস্থ্যকর কোনো ফসলের দিকে যেতে পারি।’