ছবিঃ সংগৃহীত
দ্বিতীয় দিনে মাত্র ২৯ রান যোগ করেই শেষ হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস। আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে সবকয়টি উইকেট হারিয়ে দলের সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৩৪৬ রান। সর্বোচ্চ ৮৩ রান এসেছে তানজিদ হাসানের ব্যাট থেকে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৭ সাদমান ইসলামের।
আবুধাবির শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শনিবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টায় দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরু হয়। প্রথম দিন টাইগাররা শেষ করেছিল ৮ উইকেটে ৩১৭ রান নিয়ে।
শুক্রবার টসে জিতে ব্যাটিং বেছে নিয়েছিল বাংলাদেশ। প্রথম দিনের শুরুটা দারুণ হলেও শেষটা স্বস্তি দেয়নি। দুই ওপেনারের শতরানের জুটি আর দুজনেরই অর্ধশতকে প্রথম সেশনে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের হাতেই। দ্বিতীয় সেশনে হঠাৎ নামে ব্যাটিং ধস; মাত্র ৪ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে দল। লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাটে পরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা হয়েছে, তবে দিন শেষে সংগ্রহ ছিল ৮ উইকেটে ৩১৭ রান।
শুরু থেকেই সাবলীল ছিলেন দুই ওপেনার সাদমান ইসলাম ও তানজিদ হাসান। সাদমান খেলছিলেন কিছুটা সতর্ক হয়ে, তানজিদের মেজাজ ছিল আক্রমণাত্মক। আফগান বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে দ্রুত রান তোলেন তিনি, অর্ধশতকে পৌঁছান মাত্র ৪১ বলে। তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারে অর্ধশতক ছাড়ানো ইনিংস এটি দ্বিতীয়; আগেরটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টের সেঞ্চুরি।
অন্য প্রান্তে ধীরে ধীরে ইনিংস বড় করছিলেন সাদমানও। শুরুর দিকে পাঁচ রানে ক্যাচ দিয়েও তিনি জীবন পান—কাভারে ক্যাচটি নিতে পারেননি আফগান অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শহীদি। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে তানজিদকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক উদ্বোধনী জুটি গড়ে তোলেন তিনি।
১৮ ওভারেই দুজনের ব্যাটে বাংলাদেশের এক শ রান পূর্ণ হয়। উদ্বোধনী জুটিতে শতরান দলটি সবশেষ পেয়েছিল গত বছরের নভেম্বরে, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে; এবার আবার তার দেখা মিলল। তানজিদ-সাদমানের জুটি থামে ১২৪ রানে। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ছাপ রেখে তানজিদ খেলেন মাত্র ৭১ বলে ৮৩ রানের ঝোড়ো ইনিংস। সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগালেও শেষ পর্যন্ত তিন অঙ্কে পৌঁছানো হয়নি তাঁর। ইসমত আলমের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন তিনি; দারুণ সেই ক্যাচ নিয়ে তানজিদের ইনিংসের ইতি টানেন উইকেটকিপার ইকরাম আলিখিল।
তানজিদের বিদায়েও বাংলাদেশের রান তোলার গতি খুব একটা কমেনি। ১ উইকেটে ১৩৪ রান নিয়ে বেশ ভালো অবস্থানে থেকে প্রথম সেশন শেষ করে দল। তখন সাদমান অপরাজিত ৪১ রানে, আর ক্রিজে এসে মুমিনুল হক যোগ করেছেন পাঁচ রান।
দ্বিতীয় সেশনের শুরুতেও রান তুলতে সমস্যা হয়নি। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে সাদমান ৬৭ রান করে ফেরার পর। মোহাম্মদ সেলিম সাফির বুকসমান উচ্চতার শর্ট বলে পুল খেলতে গিয়েছিলেন এই ওপেনার, কিন্তু বল মাটিতে রাখতে পারেননি; স্কয়ার লেগে ক্যাচটি তালুবন্দী করেন জিয়া-উর-রহমান। তানজিদের মতো সাদমানও সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়ে ফিরলেন অর্ধশতকের পরই।
এরপর কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন মুমিনুল হক ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। কিন্তু মুমিনুল ৩৯ রান করে বিদায় নিতেই দ্রুত ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং। ইয়ামিন আহমদজাইয়ের বলে কাভারে রহমত শাহর হাতে ধরা পড়েন মুমিনুল। কিছুক্ষণ পর সেই একই বোলারের বলে বোল্ড হন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম, ফেরেন শূন্য রানে। এরপর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন ২৯ রান করে আউট হন স্পিনার কায়েস আহমেদের বলে।
একসময় বাংলাদেশের রান ছিল ২ উইকেটে ২২১। সেখান থেকে মাত্র ৪ রান যোগ করতেই পড়ে আরও তিন উইকেট; ২২৫ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বড় বিপদে পড়ে দল। এই সময়টায় দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ান আফগান বোলাররা। পেসারদের লাইন-লেংথ ও গতি আর স্পিনারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং মিলিয়ে চাপে পড়েন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। প্রথম সেশনে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখানো দলটিই দ্রুত উইকেট হারিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা তুলে দেয় প্রতিপক্ষের হাতে।
সে অবস্থায় হাল ধরার চেষ্টা করেন লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ; তাঁদের জুটিতে আসে গুরুত্বপূর্ণ ৪২ রান। মিরাজও অবশ্য ইনিংস বড় করতে পারেননি। ইসমত আলমের অফ স্টাম্পের বাইরের একটি বল তাঁর ব্যাটে লেগে স্টাম্পে আঘাত করে, ২৪ রানে ফিরতে হয় তাঁকে। তারপর বাংলাদেশের ভরসা হয়ে ওঠেন লিটন।
লিটন দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় ইনিংসের অপেক্ষায় ছিলেন। এদিন শুরুতে কিছুটা ধীরে খেললেও পরে ছন্দ খুঁজে পান, অর্ধশতক পূর্ণ করেন মোহাম্মদ সেলিম সাফির বলে চার মেরে। আগের তিন ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন বলে এই ফিফটি তাঁর জন্য ছিল স্বস্তির। তবে অর্ধশতকের পর বেশিক্ষণ টেকেননি এই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান; সেলিম সাফির বলে ক্যাচ তুলে ৫৩ রানে সাজঘরে ফেরেন।
লিটন ফেরার পর আরও বড় চাপে পড়ে বাংলাদেশের ইনিংস। দল তিন শ রান পার করলেও তখন কত দূর যাওয়া যাবে, তা নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। শেষ দিকে উইকেটে থেকে দলকে ৩১৭ রানে পৌঁছে দেন নাঈম হাসান ও তাইজুল ইসলাম। দিন শেষে দুজনই অপরাজিত থাকায় দ্বিতীয় দিনে ইনিংস আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকছে বাংলাদেশের।
তানজিদ ও সাদমানের ব্যাটে প্রথম সেশনে বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু পরের দুই সেশনে ম্যাচে ফেরে আফগানিস্তান। বাংলাদেশের আট উইকেট তুলে নিয়ে স্বস্তি নিয়েই দিন শেষ করেছে সফরকারীরা। বাংলাদেশের লক্ষ্য থাকবে দ্বিতীয় দিনে শেষ দুই উইকেটে যতটা সম্ভব রান বাড়ানো, যাতে প্রথম ইনিংসে দাঁড় করানো যায় লড়াই করার মতো সংগ্রহ।
বাংলাদেশ একাদশ: সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান, মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন (অধিনায়ক), মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস (উইকেটকিপার), মেহেদী হাসান মিরাজ, নাঈম হাসান, হাসান মাহমুদ, তাইজুল ইসলাম ও ইবাদত হোসেন।
আফগানিস্তান একাদশ: আবদুল মালিক, সেদিকউল্লাহ আতাল, রহমত শাহ (অধিনায়ক), হাশমতউল্লাহ শহীদি, ইকরাম আলিখিল (উইকেটকিপার), জিয়া-উর-রহমান, শহিদুল্লাহ কামাল, ইয়ামিন আহমদজাই, কাইস আহমেদ, মোহাম্মদ সেলিম সাফি ও ইসমত আলম।