তিন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর দাবি সৌদি জোটের, অন্যদিকে ৪৭ পাকিস্তানিসহ ৮৫ সেনা আটকের কথা বলছে হুতিরা
ছবিঃ সংগৃহীত
বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে সংঘর্ষের পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ৮৫ সেনাকে আটক করার দাবি তুলেছে হুতিরা। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির ভাষ্য, আটক সেনাদের মধ্যে ৪৭ জন পাকিস্তানি। অন্যদিকে খামিস মুশাইত লক্ষ্য করে ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে জানান, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রিয়াদের দিকে এবং দুটি খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, তিনটিকেই আকাশে প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে।
সোমবার রাতে রিয়াদে কয়েকটি জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ পান বাসিন্দারা। তার কিছুক্ষণ আগে আকাশপথে হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়ে তাঁদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল। হুতিদের দাবি, রিয়াদে তাদের নিশানা ছিল কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ইয়াহিয়া সারি আরও জানান, খামিস মুশাইতের একটি সামরিক বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানো হয়েছে। খামিস মুশাইত শহরের অবস্থান ইয়েমেন সীমান্তের কাছে।
হুতিদের এই সামরিক মুখপাত্র সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা ও যাতায়াত নিয়ে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের ফের সতর্ক করেছেন, যদিও মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দর এ সতর্কতার আওতায় রাখা হয়নি। সারির দাবি, সৌদি আরবের অন্যান্য বিমানবন্দর এখন ‘অনিরাপদ’।
নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এমন এক সময়ে হলো, যখন শনিবারের হুতি হামলার পর থেকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ। সেদিনের হামলায় অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয় এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরদিন রোববার আরেক হামলায় নিহত হন একজন, আহত হন ১১ জন।
সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী শনিবার পর্যন্ত বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকবে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বিমান সংস্থা রিয়াদে আসা-যাওয়ার ফ্লাইট বাতিল করেছে। হুতিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে।
ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে যুক্ত বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়ছে হুতিরা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট একদিকে হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ইয়েমেন সরকারের স্থলবাহিনীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে ইয়েমেনের এই সংঘাতও তীব্রতর হয়েছে।
সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
রিয়াদে এক জ্বালানি সম্মেলনে বক্তৃতায় সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ বলেন, গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরগুলোতে হওয়া হামলা দেশটির সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তাঁর বক্তব্য, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাগুলো গুরুতর। আমাদের প্রতিক্রিয়াও সমানভাবে গুরুতর হতে হবে।’
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়ন চালিয়ে যাওয়ার ওপরও জোর দেন জ্বালানিমন্ত্রী। দেশটির অর্থনীতিকে বহুমুখী করা এবং তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো এই পরিকল্পনার লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।’
এদিকে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হলো, তা খুঁজে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দুই কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) এ কথা জানিয়েছেন।
তাঁদের তথ্যমতে, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, শুরুতে কয়েকটি ড্রোন পাঠিয়ে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে হুতিরা, আর এভাবেই পরের হামলার পথ তৈরি হয়। তারপর ছোড়া হয় ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বহর, যার কয়েকটি শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরে পৌঁছে যায়।
হুতিদের হাতে এমন কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে, যেগুলোর বিস্ফোরকবাহী অংশ উড়ন্ত অবস্থায় গতিপথ বদলাতে পারে। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো সৌদি আরবের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে দেশটি প্যাট্রিয়টসহ নানা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এক কর্মকর্তা এপিকে বলেন, হামলার আগাম সতর্কবার্তা কেন দেওয়া যায়নি, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো এক হাজার কিলোমিটারের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৬২০ মাইল দূরত্ব পেরিয়ে রিয়াদে এসেছিল। এত লম্বা পথ পাড়ি দেওয়ার পরও সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন আগেভাগে সতর্কসংকেত দিতে পারল না, তদন্তকারীরা তা দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রকে হুতিদের হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলেও গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, তা পরিষ্কার করে বলেননি। হুতিদের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে—সাংবাদিকরা এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘হুতিরা খুব খারাপ আচরণ করছে। এটা মোটেও ভালো নয়।’
এদিকে ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করলে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুতিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে অংশ নেয়, তাহলে আমরা পাল্টা জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করব না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও এ অঞ্চলে দেশটির সব স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত ও যন্ত্রণাদায়ক আঘাত হানা হবে।’
সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদেরও সতর্ক করেছেন আল-বুখাইতি। তাঁর ভাষ্য, ‘সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এসব স্থাপনা থেকে দূরে থাকতে সতর্ক করছি। কারণ, এগুলো এখন বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।’
বিনিয়োগ সম্মেলন ও ফ্লাইট সূচিতে প্রভাব
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে চলতি মাসে রিয়াদে হওয়ার কথা থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে আছে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলন ও বিশ্ব জ্বালানি কংগ্রেস। এসব আয়োজনের কর্মসূচি থেকে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় তেল নির্বাহীর নামও বাদ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় বিমান সংস্থা ইতিহাদ এয়ারওয়েজ জানায়, আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত রিয়াদগামী ও রিয়াদ থেকে ছেড়ে আসা সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে; দাম্মাম ও জেদ্দাগামী ফ্লাইটও স্থগিত রেখেছে তারা।
বাহরাইনের জাতীয় বিমান সংস্থা গালফ এয়ার জানিয়েছে, আগামী শনিবার পর্যন্ত রিয়াদের সব ফ্লাইট বাতিল থাকবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সংস্থা ডেল্টা আটলান্টা থেকে রিয়াদে সরাসরি ফ্লাইট শুরুর সময় পিছিয়ে দিয়েছে, যা আগামী ২৩ অক্টোবর থেকে চালুর কথা ছিল।
সূত্র : রাডার আফ্রিকা ও আল জাজিরা।