তেল আনতে গিয়েই ফুরিয়ে যাচ্ছে তেল, ভোগান্তিতে ৩০০ ফিট এলাকার বাসিন্দারা
ছবিঃ সংগৃহীত
গাড়িতে জ্বালানি নিতে ৩০০ ফিট সড়ক ও পূর্বাচলসংলগ্ন আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের কয়েক কিলোমিটার দূরের ফিলিং স্টেশনে ছুটতে হচ্ছে। কারণ রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে একটির পর একটি নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো সে অনুপাতে সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সেই সঙ্গে জ্বালানি নিতে যাওয়া-আসার পথে অতিরিক্ত যান চলাচলও তৈরি হচ্ছে। কুড়িল, খিলক্ষেতসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে গিয়ে পড়ছে এর প্রভাব।
আব্দুল্লাহ আল মামুন থাকেন ৩০০ ফিট সড়কসংলগ্ন একটি আবাসন প্রকল্পে। নিজের গাড়ির জ্বালানির জন্য তাঁকে নিয়মিত কুড়িল বা বিমানবন্দর সড়কের ফিলিং স্টেশনে যেতে হয়। তিনি জানান, কয়েক লিটার জ্বালানি গাড়িতে নিয়ে তেল আনতে বের হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি পথেই শেষ হয়ে যায়।
তাঁর ভাষায়, ‘দুই দিন আগে গাড়িতে কয়েক লিটার তেল নিয়ে তেল আনতে বের হয়েছিলাম। যেতে যেতেই অর্ধেক তেল শেষ হয়ে যায়। কোনো কারণে যদি তেল নিতে না পারতাম, তাহলে হয়তো বাকি তেলও শেষ হয়ে রাস্তায় আটকে থাকতে হতো। আশপাশে পর্যাপ্ত ফিলিং স্টেশন থাকলে এত দূরে যেতে হতো না।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কুড়িল থেকে ৩০০ ফিট সড়ক ধরে পূর্বাচল প্রকল্পের আগ পর্যন্ত বসুন্ধরা, পুলিশ হাউজিং সোসাইটি, নৌবাহিনী, স্বদেশ স্বর্ণালী, স্বদেশ সানভ্যালি, ইউনাইটেডসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস করেন। এসব এলাকার বাসিন্দাদের গাড়ির জ্বালানি সংগ্রহ করতে হলে তুলনামূলক দূরের ফিলিং স্টেশনের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে।
অপরদিকে গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোড থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাতেই একাধিক ফিলিং স্টেশন আছে। অর্থাৎ স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর একটি অংশে ফিলিং স্টেশনের ঘনত্ব বেশি, কিন্তু পূর্বাঞ্চলের দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকাগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা চাহিদার তুলনায় কম।
বাসিন্দারা দাবি করছেন, এসব এলাকায় পর্যাপ্ত ফিলিং স্টেশনের অভাবে প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন শুধু জ্বালানি সংগ্রহ করতেই বাড়তি পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে জ্বালানি খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি মূল্যবান কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে। সেই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যান চলাচলের কারণে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যানজটও বেড়ে চলেছে।
স্থানীয়রা যে তথ্য দিয়েছেন, সে অনুযায়ী এ এলাকার কোনো কোনো গাড়িকে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য বাড়তি পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে—কুড়িল পর্যন্ত ১০ কিলোমিটারের বেশি, খিলক্ষেত পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার এবং জলসিঁড়ি পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার।
এর ফলে জ্বালানি আনতে গিয়ে খরচ হওয়া জ্বালানির একটি অংশ কার্যত ব্যয় হচ্ছে তেল আনার পেছনেই। যাতায়াতে কিছু ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পর্যন্ত বাড়তি সময় লেগে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত গাড়িতেই সীমিত থাকছে না। জ্বালানি সংগ্রহ করতে গণপরিবহন, পণ্যবাহী যান, রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ নানা ধরনের যানবাহনও এসব সড়কে বাড়তি চলাচল করছে।
স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, পূর্ব ঢাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ এই ধারায় চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে দৈনিক যান চলাচল প্রায় তিন থেকে চার লাখে পৌঁছাতে পারে। তখন স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে আরও বেড়ে যাবে অতিরিক্ত যান চলাচলের চাপ। সংশ্লিষ্টরা এটাও মনে করছেন, মহাখালী বাস ডিপো পুরোপুরি স্থানান্তরিত হলে এ চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।
বাড়তি এই যান চলাচল আর্থিক ও পরিবেশগত দিক থেকেও কম প্রভাব ফেলছে না। হিসাব বলছে, জ্বালানি সংগ্রহের জন্য যদি প্রতিদিন ৫০ হাজার যানবাহন গড়ে ৭ কিলোমিটার বাড়তি পথ পাড়ি দেয়, তবে দিনে মোট অতিরিক্ত চলাচলের পরিমাণ হয় প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার।
একটি যানবাহনে প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ০.১০ থেকে ০.১২ লিটার জ্বালানি খরচ হয় বলে ধরে নিলে বাড়তি এই চলাচলে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪২ হাজার লিটার অতিরিক্ত জ্বালানি লাগতে পারে।
অর্থাৎ স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত ফিলিং স্টেশনের অভাবে ক্ষতি কেবল যানজট ও কর্মঘণ্টাতেই হচ্ছে না, প্রতিদিন বাড়তি খরচ হয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিও। দীর্ঘ মেয়াদে এর আর্থিক মূল্য উল্লেখযোগ্য অঙ্কে গিয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বাড়তি জ্বালানি পোড়ানোর কারণে একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ ও বায়ুদূষণও বাড়ছে। যানবাহনের বাড়তি চাপে শব্দদূষণের মাত্রাও বাড়তে পারে। ফলে বিষয়টি শুধু জ্বালানি সংগ্রহের সুবিধা-অসুবিধায় সীমিত নয়; নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও যানজটের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ আদেশ দিয়ে নতুন ফিলিং স্টেশন স্থাপনের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছিল। তবে সেই একই সময়ে চালু রাখা হয় এলপিজি স্টেশন স্থাপনের কার্যক্রম।
তাদের দাবি, নতুন ফিলিং স্টেশন স্থাপনের সুযোগ ওই সময় সীমিত হয়ে যায়; এ কারণে পরবর্তীকালে দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকাগুলোর জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
নতুন নতুন আবাসিক এলাকা তৈরি হয়েছে, বেড়েছে জনসংখ্যা, ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যাও বেড়েছে—এটি এক দিকের চিত্র। অন্য দিকে এসব এলাকার ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা বিবেচনা করে পর্যাপ্ত ফিলিং স্টেশন স্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়নি। সে কারণেই বাসিন্দাদের এখন দূরের স্টেশনগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা একটি সমন্বিত সমীক্ষার দাবি জানিয়েছেন, যেখানে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তাদের মতে, সমীক্ষা করে যানবাহনের সংখ্যা, জনসংখ্যা, ভবিষ্যৎ আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ এবং সড়কের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া দরকার; এরপর পরিকল্পিতভাবে ফিলিং স্টেশন স্থাপন করতে হবে অন্তত দুই থেকে তিনটি উপযুক্ত স্থানে।
তবে স্টেশন স্থাপন করতে গেলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে—অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নগর পরিকল্পনা, সড়কের ধারণক্ষমতা, যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা এবং অপেক্ষমাণ গাড়ির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ কাজে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), রাজউক, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
পুলিশ অফিসার হাউজিং সোসাইটিতে বসবাসকারী মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে ফিলিং স্টেশন স্থাপন করা হলে জ্বালানি নিতে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। এতে অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল, জ্বালানি ও অর্থের অপচয় এবং মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া কমানো সম্ভব হবে।’
ইউনাইটেড সিটি এলাকায় থাকেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সংগ্রহের জন্য অহেতুক যানবাহন চলাচল কমানো গেলে কুড়িল-খিলক্ষেত এলাকার ওপর বাড়তি চাপ কমবে। একই সঙ্গে বায়ু ও শব্দদূষণও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পূর্ব ঢাকার এ অঞ্চলে দ্রুত আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ ঘটছে। ভবিষ্যতে যানবাহন ও জ্বালানির চাহিদা আরও বাড়বে। তাই এখনই ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা দরকার।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি জানান, নতুন পেট্রোলপাম্প অনুমোদনের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় দেওয়া একটি বিশেষ অফিস আদেশের মাধ্যমে। ২০১৯-২০ সালের দিকে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণীত হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, সরকার নতুন পেট্রোলপাম্প ও ফিলিং স্টেশন অনুমোদনের জন্য একটি খসড়া নীতিমালা চেয়েছে বিপিসির কাছে। বিপিসির পক্ষ থেকে এর আগে মন্ত্রণালয়ে একটি খসড়া নীতিমালা পাঠানো হয়েছিল, তবে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সেটি আবার বিপিসির কাছেই ফেরত পাঠানো হয়েছে।
বিপিসির ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে খসড়া নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, মতামতও নেওয়া হয়েছে। এখন সেটি যাচাই-বাছাইয়ের শেষ পর্যায়ে আছে; নীতিমালা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শিগগিরই শেষ হতে পারে। তাঁর মতে, এটিই নতুন ফিলিং স্টেশন অনুমোদন বন্ধ থাকার মূল কারণ।
নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, নগর অবকাঠামোর পরিকল্পনা হওয়া দরকার নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের বসবাস ও প্রয়োজনকে ভিত্তি করেই। পরিকল্পনায় সমন্বয়ের অভাব থাকলে তার নেতিবাচক প্রভাব পরে বাসিন্দাদেরই বহন করতে হয়।
এই নগর বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘মানুষের বসবাস বাড়ছে; কিন্তু সেই অনুপাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না বা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মানুষকে অন্য এলাকায় যেতে হচ্ছে এবং এতে ওই এলাকাগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পূর্ব ঢাকার দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকায় ভবিষ্যতে জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা কত হবে, তা মাথায় রেখে জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামোর পরিকল্পনা এখনই করা জরুরি। নইলে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য বাড়তি পথ পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা চলতেই থাকবে, পাশাপাশি যানজট, জ্বালানি অপচয় ও পরিবেশদূষণের চাপও আরও বাড়তে পারে।