রাষ্ট্রপতির আগমনকে ঘিরে ঠাকুরগাঁওয়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
শৈশব ও কৈশোরের পুরোটা সময় তাঁর কেটেছে ঠাকুরগাঁও শহরের কর্মচঞ্চল পরিবেশে। শহরের কেন্দ্রস্থল বড়মাঠ তাঁর বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষেই অবস্থিত। যে শহরের প্রতিটি গলি, বাজার-মহল্লা ও পথঘাট তাঁর নখদর্পণে, আজ সেই শহরই তাঁকে ঘিরে সরগরম। আগামীকাল রোববার রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবার নিজ জন্মভূমি ঠাকুরগাঁওয়ে পা রাখছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর এই আগমনকে কেন্দ্র করে গোটা ঠাকুরগাঁওয়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর আবহ।
কোথাও গড়ে তোলা হচ্ছে তোরণ, কোথাও চলছে আলোকসজ্জার প্রস্তুতি। রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও যেন নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত নেই। শহরকে ঝকঝকে ও গোছালো রূপ দিতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন পৌরসভার কর্মীরা। সব মিলিয়ে নিজেদের প্রিয় মানুষটিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবারের মতো স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হয়ে উঠেছে ঠাকুরগাঁও। শহরের প্রতিটি পথেই এখন অপেক্ষা রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আগমনের। প্রশাসনিক তোড়জোড়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনেও জেগেছে বাড়তি আগ্রহ ও উদ্দীপনা।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথমবারের মতো আগামী রবি ও সোমবার সরকারি সফরে নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পা রাখছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই রাষ্ট্রীয় সফরকে ঘিরে প্রশাসনের বিভিন্ন প্রস্তুতির চেয়েও যেন বেশি আবেগঘন সাধারণ মানুষের আগ্রহ।
অনেকের কাছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় রাজনীতির চেনামুখ, আবার কারও কাছে তিনি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ একজন রাজনীতিবিদ। তবে ঠাকুরগাঁওয়ের বহু মানুষের কাছে তিনি আজও সেই চিরচেনা ‘আলমগীর স্যার’—নিজ শহরের আপনজন। তাই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের শেকড়ের টানে নিজ মাটিতে ফেরা ঠাকুরগাঁওবাসীর কাছে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং একই সঙ্গে গর্ব, আনন্দ, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে মেশা এক মুহূর্ত।
আবুল কালাম মো: লুৎফর রহমান স্বাক্ষরিত রাষ্ট্রপতির সফরসূচি অনুসারে, সফরের প্রথম দিন অর্থাৎ রোববার সকাল ১০টায় রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হেলিকপ্টারযোগে ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবেন। সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ঠাকুরগাঁও মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়াম মাঠে তাঁর অবতরণের সূচি রয়েছে। এরপর সেখান থেকে তিনি রওনা হবেন জেলা সার্কিট হাউসের দিকে, যেখানে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে।
এরপর তিনি শহরের সেনুয়া পাড়ায় অবস্থিত পারিবারিক কবরস্থানে গিয়ে বাবা সাবেক মন্ত্রী মরহুম মির্জা রুহুল আমীন (চোখামিয়া) এবং মা ফাতেমা বেগমের কবর জিয়ারত করবেন।
কবর জিয়ারত সম্পন্ন করার পর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যাবেন শহরের কালীবাড়িতে অবস্থিত নিজ বাসভবনে। সেখানে দুপুরের আহার ও কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর বিকেলে তিনি উপস্থিত হবেন ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে, যেখানে নাগরিক কমিটির উদ্যোগে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে জেলার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতির প্রস্তুতি চলছে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তিনি নিজ বাসভবনে ফিরে গিয়ে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হবেন। ওই বাসভবনেই তাঁর রাত যাপনের কথা রয়েছে।
সফরের দ্বিতীয় দিনে রাষ্ট্রপতি ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়ক-সংলগ্ন সদর উপজেলার জামালপুর এলাকায় প্রস্তাবিত ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এই কাজ সম্পন্নের পর তিনি নিজ বাসভবনে ফিরে দুপুরের খাবার সেরে বিশ্রাম নেবেন। পরবর্তীতে তিনি যাবেন সার্কিট হাউসে। সবশেষে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার উদ্দেশে ঠাকুরগাঁও ত্যাগ করবেন বলে সূচিতে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রপতির এই সফরকে কেন্দ্র করে সমগ্র জেলাজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সফরের সম্ভাব্য স্থান, চলাচলের পথ এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকাসমূহে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. আবু মো. খয়রুল কবির বলেন, ‘তিনি কেবল রাষ্ট্রপতিই নন, তিনি আমাদের ঠাকুরগাঁওয়েরই সন্তান। দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে তিনি ফিরছেন নিজের মানুষের কাছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্ব ও আবেগের একটি মুহূর্ত। আমরা চাই, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে তাঁকে বরণ করে নিক।’
জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে এই প্রথম আগমন জেলাবাসীর জন্য আনন্দ, গর্ব ও আবেগের একটি বিষয়। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি আরও জানান, রাষ্ট্রপতির এই সফরকে ঘিরে জেলার সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে।
জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, আগামী ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির দুই দিনব্যাপী সফরকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। সফরের প্রতিটি কর্মসূচি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির দুই দিনের এই সফরকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁওয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর সফরের প্রতিটি কর্মসূচি, যাতায়াতের পথ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে নিরাপত্তার আওতাভুক্ত করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।