ছবিঃ সংগৃহীত
২০১৫ সালে ইয়েমেন সংকটের সময় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ না দেওয়ার পক্ষে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ। দীর্ঘ ১১ বছর পর এবার দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক সামরিক জোটে নতুন করে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
এবার সংসদকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়েই রিয়াদে দ্রুত অতিরিক্ত সামরিক শক্তি পাঠাতে রাজি হয়েছে বর্তমান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে যে সেনাবাহিনীরই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ও একক ক্ষমতা, তা এতে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক গত আগস্ট মাসে একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছিল। ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সম্প্রতি ধারাবাহিক হামলা চালানোর প্রেক্ষাপটে চুক্তিটি সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশটির জল, স্থল ও বিমান—তিন বাহিনীরই সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন। সেই সঙ্গে তাকে দেওয়া হয়েছে আজীবন পদমর্যাদা এবং যেকোনো ধরনের ফৌজদারি প্রসিকিউশন থেকে পূর্ণ আইনি দায়মুক্তি।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সংসদকে এড়িয়ে রিয়াদে সৈন্য পাঠানোর এ সিদ্ধান্ত মূলত এ কথারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য বাড়ছে। সিদ্ধান্তটি সামনে এল এমন এক সময়ে, যখন কারারুদ্ধ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ অভিযোগ করছে যে দেশটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে সেনাবাহিনী; এই দাবিতে দলটি রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলও পরিচালনা করছে। এ পরিস্থিতি নিয়ে আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মন্তব্য করেছেন, পাকিস্তানের সংসদ সেনা না পাঠানোর পক্ষে ভোট দিয়েছে আর সামরিক বাহিনী সে সিদ্ধান্ত মেনে চলেছে—অতীতে এমন বহু সময় দেখা গেছে। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রবেশ করেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক যুগে।
প্রতিরক্ষা চুক্তি ও সৈন্য মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জোট গঠন ও সেনা পাঠানোর প্রক্রিয়া প্রয়োজনীয় সব সরকারি নিয়মাবলি ও কার্যপ্রণালি মেনেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তে মন্ত্রিসভা বা সংসদের কোনো সম্মতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তারা পরিষ্কার করেনি। উল্টো পুরো বিষয়টিকে অপারেশনাল বা পরিচালনগত গোপনীয়তার অংশ বলে উল্লেখ করে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছে মন্ত্রণালয়।
ইসলামাবাদের এ পদক্ষেপ দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন সংকট সমাধানে পাকিস্তান এখন ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এ অবস্থায় পাকিস্তানি সেনারা সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লে তেহরানের সঙ্গে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল বা চরম অবনতি দেখা দিতে পারে।
লোহিত সাগরে সৌদি আরবগামী জাহাজ চলাচলে গত জুলাই মাস থেকেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে হুতি বিদ্রোহীরা। তখন থেকে বেশ কয়েকটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় তারা হামলা চালিয়েছে। এমনকি গত সপ্তাহে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দাবি করে, মদিনার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হুতি বিদ্রোহীরা হামলা চালিয়েছে; কেন্দ্রটি মসজিদে নববীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। হুতি কর্তৃপক্ষ অবশ্য এ দাবির সত্যতা পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
এই সংকটের মধ্যেই রিয়াদে এক জরুরি বৈঠকে সৌদি ও তুর্কি সমকক্ষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন অসীম মুনির। মক্কা ও মদিনায় সম্ভাব্য আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানায় তিন দেশই। একই সঙ্গে নিজ নিজ জাতীয় আইন মেনে আগে থেকে নির্ধারিত সামরিক সক্ষমতা দেওয়া এবং দ্রুত সেনা মোতায়েন নিশ্চিত করার বিষয়ে তারা একমত হয়। তবে কতজন সৈন্য এ অভিযানে অংশ নেবে, তাদের মিশন সুনির্দিষ্টভাবে কী হবে, মোতায়েনের ব্যয়ভার ও মেয়াদই বা কত দিনের—এসবের কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ২০১৫ সালের সঙ্গে এখনকার পরিস্থিতির মূল ফারাক আইনে নয়, রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে। সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব দেশটির সংবিধানে তখনও বহাল ছিল, এখনও আছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতির মূল চাবিকাঠি থেকেছে সেনাসদরের হাতেই। আর অসীম মুনির তার পূর্বসূরিদের তুলনায় দেশের ভেতরে অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অবস্থান গড়ে নিতে পেরেছেন।
ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ ও তাদের জোটসঙ্গী পাকিস্তান পিপলস পার্টির সঙ্গে সংবাদ সংস্থাটি যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল, তবে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে সেনা মোতায়েনকে তাদের দল সমর্থন করছে কি না, তা স্পষ্ট করেননি ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের মুখপাত্র জুলফি বুখারি। তবে তিনি বলেছেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে বিতর্ক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ হওয়া উচিত ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সচেতনতার সঙ্গে।
‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র মূল খসড়া বা পাঠ্য এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এটি ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত একটি যৌথ চুক্তিরই ধারাবাহিকতা। ওই চুক্তির আওতায় চলতি বছরের মে মাসের মধ্যেই পাকিস্তানে তৈরি প্রায় ৮০০০ সৈন্য সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল। সরকারি পক্ষের দাবি, ফিল্ড মার্শাল ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার বিশ্বাস ও সমন্বিত সম্পর্কই মূলত কাজ করেছে সেসব সাংবিধানিক পরিবর্তনের পেছনে, যা সম্প্রতি এনেছে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার।
কিংসে কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ এ পরিস্থিতিকে একটি ‘পুনরাবৃত্তিমূলক চক্র’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে একপ্রকার অপরিহার্য নিয়ামক হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মিত্র ও অংশীদাররা, আর তাতে দেশের ভেতরে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা হয়তো বৈদেশিক অংশীদাররা তৈরি করেনি, তবে তারা এ ব্যবস্থাকে ক্রমাগত সুবিধা বা উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। যে শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার মতো শক্তিশালী কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, সেটি কোনো প্রতিশ্রুতিতে প্রবেশ করতে অত্যন্ত পটু হলেও পরে তার মূল্য চুকাতে হলে তা সংশোধন করা বা সামলে নেওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
সূত্র: রয়টার্স