সম্পদ নয়, সম্পর্কই মানুষের আসল ঐশ্বর্য
ছবিঃ সংগৃহীত
সুরা আনফালের প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী!) লোকেরা তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (বিষয়ে সিদ্ধান্তের) এখতিয়ার আল্লাহ ও রাসুলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ১)
এ আয়াতের একটি বিশেষ সৌন্দর্য আছে—জানতে চাওয়া হয়েছিল আনফাল তথা সম্পদ সম্পর্কে, অথচ আল্লাহর নির্দেশ এলো পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক করে নেওয়ার।
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ কী?
আরও টাকা জমাও, সম্পদ আরও বাড়াও—আজকের পৃথিবী মানুষকে এই শিক্ষাই দেয়। ইসলামের কথা কিন্তু ভিন্ন—সম্পর্ককে বাঁচাও, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখো, ভালোবাসা টিকিয়ে রাখার জন্য সম্পদ খরচ করো। আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি এমন এক সময়ে, যখন অনেক মানুষ সম্পদের দিক থেকে ধনী হলেও সম্পর্কের দিক থেকে দরিদ্র।
কারও হাতে কোটি টাকা, কিন্তু বাবার দোয়া তার ভাগ্যে জোটে না। কারও ব্যাংকে জমা কোটি টাকা, কেউ আবার একের পর এক জমির মালিক, অথচ তার বৃদ্ধ মা নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলেন।
একবার চিন্তা করুন—শৈশবে যে বাবা হাত ধরে হাঁটা শিখিয়েছিলেন, বার্ধক্যে এসে তাকে যদি সন্তানের অপেক্ষায় দিন পার করতে হয়, তাহলে ওই সন্তানের সম্পদের কী মূল্য? নিজের ঘুম হারাম করে যে মা সন্তানকে মানুষ করেছেন, তিনি শেষ বয়সে অবহেলার শিকার হলে ওই সন্তানের সফলতাই বা কোথায়?
সত্যি বলতে, সম্পদ থেকে মানুষ পায় সচ্ছলতা, আর সুখ আসে সম্পর্ক থেকে। ঘর তৈরি হয় সম্পদে, পরিবার তৈরি হয় ভালোবাসায়।
সম্পদ দিয়ে বিছানা কেনা যায়, কিন্তু শান্তির ঘুম কেনা যায় না। ওষুধ কেনা যায় সম্পদে, মায়ের দোয়া কেনা যায় না।
তাই প্রশ্ন ওঠে—যার কোটি টাকা থাকলেও মা-বাবার সন্তুষ্টি নেই, বড় বাড়ি থাকলেও ভাই-বোনের ভালোবাসা নেই, জমির দলিল থাকলেও আত্মীয়তার বন্ধন নেই—তাকে কি সত্যিই সফল বলা যায়? ইসলামের কথা হলো, ব্যাংক ব্যালান্স মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ নয়; সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন আর তাদের অন্তরের ভালোবাসা। কেননা হারানো টাকা আবার ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু বাবা চলে গেলে তিনি আর ফিরে আসেন না। মা চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনার সাধ্য পৃথিবীর কোনো সম্পদের নেই। একজন ভাইকে হারালে কোটি টাকা দিয়েও আরেকজন ভাই কেনা সম্ভব নয়; একজন বোনকে হারালে তার বিকল্পও পৃথিবীর কোনো বাজারে পাওয়া যায় না। ইসলাম এ কারণেই শিক্ষা দেয়—সম্পর্কের দাম সম্পদের চেয়ে বেশি। সম্পদ ক্ষণস্থায়ী, আর সম্পর্ক অমূল্য। সম্পদ হলো উত্তরাধিকার, সম্পর্ক হলো আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত।
কোটি টাকা দিয়ে একজন বাবা কেনা যায় না
একটা প্রশ্ন রাখি—পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিকে যদি বলা হয়, তোমার সব সম্পদ দিয়ে দাও, তোমার মৃত মাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি—সে কি পারবে? একজন মাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো ব্যাংক, রাষ্ট্র, আদালত, প্রযুক্তি বা বিজ্ঞানের নেই।
তাহলে আসল সম্পদ ছিল কে—মা, নাকি ব্যাংকের টাকা? কোটি টাকা খরচ করেও মা কেনা যায় না, বাবা কেনা যায় না, পাওয়া যায় না ভাই-বোনও। একইভাবে পাওয়া যায় না চাচা, ফুফু, মামা, খালাকেও। কেননা এগুলো সম্পদ নয়।
এগুলো আল্লাহপ্রদত্ত এমন নিয়ামত, যার বাজারমূল্য বলে কিছু নেই। ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্কের (সিলাতুর রাহিম) গুরুত্ব এত বেশি যে তা রক্ষা করার নির্দেশ কোরআন ও হাদিসে বারবার এসেছে। আল্লাহর রহমতের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত; আর এ সম্পর্ক ছিন্ন করার কঠোর নিন্দা করা হয়েছে।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথম ব্যক্তির আছে ২০০ কোটি টাকা—সঙ্গে বড় ব্যবসা, অসংখ্য জমি, বহুতল ভবন আর বিলাসবহুল গাড়ি। অথচ তার বাবা, মা, ভাই, বোন—কেউই নেই। ঈদের দিনে তার দরজায় কেউ কড়া নাড়ে না। অসুখে পড়লে মাথায় হাত রাখার মতো কেউ থাকে না, সাফল্যের খবর শোনানোর মতো মানুষও নেই। তার জীবন এক নিঃসঙ্গ জীবন।
দ্বিতীয় ব্যক্তি একজন সাধারণ কৃষক। তার টাকা অল্প, ঘরও ছোট। তবে তার মা-বাবা জীবিত, পাশে আছে ভাই, আর বোন তার জন্য দোয়া করে। ঈদের সকালে তার অপেক্ষায় থাকেন মা, সন্তানের জন্য হাত তুলে দোয়া করেন বাবা। বিপদ এলে পাশে এসে দাঁড়ায় ভাই, তার কষ্টে কাঁদে বোন।
এবার বলুন তো, কে ধনী—ব্যাংকে যার টাকা আছে সে, নাকি যার জন্য দোয়া করার মতো মানুষ আছে সে? এ প্রশ্নে ইসলামের জবাব পরিষ্কার।
সম্পদ মানুষের প্রকৃত শক্তি নয়; প্রকৃত শক্তি হলো তার পরিবার, আত্মীয়তা আর ভালোবাসার বন্ধন। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে কোরআন নির্দেশ দিয়েছে, আর সম্পর্ক ছিন্ন করাকে উল্লেখ করেছে সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে।
সুতরাং বলা চলে—মা থাকলে কেউ গরিব নয়; বাবা থাকলে কেউ নিঃস্ব নয়; ভাই থাকলে কেউ একা নয়; আর বোন থাকলে তার জন্য দোয়া করার মতো একটি হৃদয় থাকে।
সুরা আনফালের বিস্ময়কর ঘোষণা
বদর যুদ্ধ তখন শেষ হয়েছে। ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় বিজয় এসেছে মুসলমানদের হাতে। এরপর সামনে চলে এলো গনিমতের সম্পদের বিষয়টি। সাহাবায়ে কেরামের জিজ্ঞাসা ছিল—এই সম্পদ কার? কে কত পাবে? কীভাবে বণ্টন হবে? আল্লাহ তাআলা এর জবাব দিলেন, ‘তারা তোমাকে গনিমতের সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, গনিমতের বিষয় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক রাখো।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ১)
একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন—জানতে চাওয়া হয়েছিল সম্পদের কথা, অথচ আল্লাহর প্রথম উত্তরটি এলো সম্পদ নিয়ে নয়, সম্পর্ক নিয়ে। প্রশ্ন ছিল—সম্পদ কার? আল্লাহ বললেন—তোমাদের সম্পর্ক ঠিক করো।
প্রশ্ন ছিল—কে কত পাবে? আল্লাহ বললেন—তোমাদের হৃদয়গুলো ভেঙে ফেলো না।
প্রশ্ন ছিল—সম্পদের হিসাব কী? আল্লাহ বললেন—ভ্রাতৃত্ব রক্ষা করো।
যেন আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করছেন—তোমরা ব্যস্ত সম্পদের হিসাব নিয়ে, আর আমি দেখছি সম্পর্কের হিসাব।
তোমরা চিন্তিত মাল নিয়ে, আমি চিন্তিত হৃদয় নিয়ে। তোমরা দেখছ জমা হওয়া সম্পদ, আমি দেখছি ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক।
সুরা আনফালের প্রথম আয়াত সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা দেয় তা হলো—সম্পদ হারালে কিছু হারাবে, কিন্তু সম্পর্ক হারালে সব হারাবে। কেননা সম্পদ পুনরায় অর্জন করা সম্ভব, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া একজন ভাইকে আর কেনা যায় না।
বোনকে হারালে তাকে আর ফিরে পাওয়া যায় না। চলে যাওয়া বাবাকে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ দিয়েও ফেরানো যায় না। আর মা চলে গেলে পৃথিবীর সমস্ত সোনা-রুপাও তার একটি দোয়ার সমান হয় না। কোরআনের প্রথম আহ্বান তাই—সম্পদের আগে সম্পর্ক, হিসাবের আগে হৃদয়, অধিকারের আগে ভ্রাতৃত্ব, সম্পদের আগে আত্মীয়তা। সুরা আনফালের বিস্ময়কর শিক্ষা এটাই, ইসলামের সভ্যতাও এটাই—যা সম্পদের সভ্যতা নয়, সম্পর্কের সভ্যতা।
লেখক: মুদাররিস, জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া ও প্রিন্সিপাল, মাদরাসাতুল কুরআন লিলবানাত