সৌদিতে একমাত্র ছেলের মৃত্যু, লাশ দেশে আনার অনিশ্চয়তায় বরগুনার ঋণগ্রস্ত পরিবার
ছবিঃ সংগৃহীত
‘আমার ছেলের সঙ্গে একটু যোগাযোগ করাইয়া দেও, তোমাগো হাত-পা ধইরা কই, যোগাযোগ করাইয়া দেও। আমার একটা সন্তান, ও ছোট থাকা সময়ে স্বামী হারাইছি, আমার কেউ নেই এই ছেলে ছাড়া। আমাকে যে মা কইয়া ডাকবে, এমন কেউ নেই। মোর মানিকরে আইনে মোর কোলে দেও! ওরে হানিফা তোর মায়রে কেউ মা কয় না, তুই কী কইয়া গেলি, আমি তোরে কেমনে ভুইলা থাকমু?’
মা ছাহেরা বেগম রবিবার (১১ অক্টোবর) সকালে নিজ বাড়িতে বিলাপ করতে করতে এই কথাগুলো বলছিলেন, কান্নায় তাঁর বুক ভেঙে যাচ্ছিল। একমাত্র সন্তান হানিফাকে সৌদি আরবে হারিয়ে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে তাঁর বুকফাটা আহাজারি আর সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতিতে।
হানিফ (৩৬) ওই এলাকারই প্রয়াত জালাল মিয়ার ছেলে। তাঁর দুই সন্তান, ১১ বছর বয়সী ছেলে মো. জেনায়েদ ও ৫ বছর বয়সী মেয়ে মোসা. ছামিরা। হানিফের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখনই তিনি পিতাকে হারান; তাঁর পিতা সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন।
পরিবারের ভাষ্য, হানিফা (৩৬) সৌদি আরবে যান আড়াই বছর আগে, দালালের মাধ্যমে; সে জন্য ধারদেনা করে দিতে হয়েছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ভিসা জটিলতার কারণে তিনি ২ বছর ধরে একটি পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় অবৈধভাবে শ্রমিকের কাজ করছিলেন।
পাঁচ মাস আগে ভিসা বৈধ করার আশায় দালালদের আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়, যা জোগাড় করা হয়েছিল বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে। কিন্তু গত ৩ অক্টোবর প্রবাসেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন হানিফা, আর সেদিনই তাঁর মৃত্যুর খবর পায় পরিবার। মৃত্যুর সঠিক কারণ অবশ্য পরিবার এখনো জানতে পারেনি। অর্থসংকট এবং বৈধ কাগজপত্র না থাকায় হানিফার লাশ দেশে ফেরানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একমাত্র কর্মক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে পরিবারটি এখন এক অনিশ্চয়তায় পড়েছে, লাশ ফিরিয়ে আনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তাদের দিন কাটছে। দ্রুত সরকারি সহায়তায় হানিফার মরদেহ নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও স্বজনরা।
নিহতের স্ত্রী কাজল আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, স্বামীর বিদেশ যাওয়ার সময় তিনি ধারদেনা করে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। পরে ভিসা বৈধ করার আশায় আবারও ৬টি এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দেন ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, দুটি অবুঝ সন্তান নিয়ে সংসার চালানোর মতো কোনো অবস্থাই এখন তাঁর নেই, উল্টো মাথার ওপর ঋণের পাহাড়। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানেরা কার মুখের দিকে তাকাবে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। সরকারের কাছে তাঁর আকুল আবেদন, স্বামীর লাশটা দেশে এনে দাফনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক, যেন তাঁর ছেলে-মেয়ে তাদের বাবার কবরটা দেখতে পারে। সরকারের কাছে তিনি আর কিছু চান না বলেও জানান।
তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ সরকার বলেন, পরিবারের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির পক্ষ হয়ে দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলে লাশ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে উপজেলা প্রশাসন।