হিংসুক নিজেই পোড়ে নিজের আগুনে: হিংসা-বিদ্বেষ নিয়ে ইসলাম যা বলে
ছবিঃ সংগৃহীত
স্বস্তি বলে কিছু থাকে না হিংসুক ও বিদ্বেষী মানুষের জীবনে, কোনো অবস্থাতেই নয়। সৎ বন্ধু তার জোটে না, মনে সারাক্ষণ কাজ করে হতাশা। তার হৃদয় যেন এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড, যেখান থেকে সব সময় বেরিয়ে আসে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র, ধোঁকা ও মিথ্যাচারের স্ফুলিঙ্গ। নিজেকে সে সর্বদা বিজয়ী মনে করে, অথচ সবচেয়ে পরাজিত সে-ই। নিজেকে ভাবে বীর, অথচ সবচেয়ে ভীরুও সে-ই।
হিংসা কাকে বলে
মহান আল্লাহ অন্যকে যে নিয়ামত দিয়েছেন, তার বিনাশ কামনা করা এবং নিজে তা না পাওয়ায় ব্যথা অনুভব করা—এরই নাম হিংসা। হিংসার পিছু পিছু আসে বিদ্বেষ; তখন মানুষ সর্বদা ওই ব্যক্তির মন্দ কামনা করতে থাকে। যেমন—মুমিনদের বিরুদ্ধে মুনাফিকদের আচরণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমাদের কোনো কল্যাণ স্পর্শ করে, তাতে তারা অসন্তুষ্ট হয়। আর যদি তোমাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তাতে তারা আনন্দিত হয়।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১২০)
কারও কারও মনে হিংসা মজ্জাগত, অনেকটা স্বভাবের মতোই। এরা সবখানে নিজেদের হকদার মনে করে, আবার নিজেদের আবিষ্কার করে নিগৃহীত হিসেবে। অথচ আল্লাহ তাদের যে নিয়ামত দিয়েছেন, সেদিকে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই; নেই নিয়ামতের শুকরিয়াও।
এ ধরনের লোকের ক্ষতি থেকে বাঁচতে হলে প্রতিদিন সুরা ফালাক ও নাস পড়ে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতে হবে। পবিত্র কোরআনে এসেছে: ‘এবং (আমি আশ্রয় চাই) হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।’ (সুরা : ফালাক, আয়াত : ৫)
হিংসার আগুনে পুড়ে ছারখার
অন্যকে হত্যা করার আগে হিংসা-বিদ্বেষ হত্যা করে নিজেকেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘…বলে দাও, ‘তোমরা তোমাদের রাগ নিয়ে মরো!’ নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত।’’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১১৯)
মেধা, শক্তি, সম্পদ ও মর্যাদায় মহান আল্লাহ মানুষকে পরস্পরে উঁচু-নিচু করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। সুতরাং মুসলমানের কর্তব্য অন্যের কল্যাণকামী হওয়া এবং অন্তরে কারো প্রতি হিংসার কালিমা না রাখা। কখনো যদি তা এসেই পড়ে, তবে যেন বুদবুদের মতো উবে যায়, কচুপাতার পানির মতো ঝরে যায়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না, একে অন্যের পেছনে লেগে থেকো না, একে অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ কোরো না; বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও, পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৩৫)
আত্মচিন্তায় বিভোর শকুন কামনা করলেই গরুর মৃত্যু হয় না; একইভাবে হিংসুকের হিংসাও কারো নিয়ামত ছিনিয়ে নিতে পারে না। কেউ যখন হিংসাকে অগ্রাহ্য করে প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলে, হিংসার আগুন তখন বাড়তে থাকে। আর সেই আগুনে জ্বলে-পুড়ে ছাই হতে থাকে খোদ হিংসুকই; ছারখার হয়ে যায় তার আমলও। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থেকো। কারণ হিংসা নেক আমল গ্রাস করে নেয়, যেভাবে আগুন গ্রাস করে লাকড়ি (অথবা ঘাস)।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯০৫)
স্বার্থে আঘাত ও অতি লোভ মানুষকে হিংসুক করে
মানুষ হিংসুক হয়ে ওঠে স্বার্থে আঘাত লাগলে, কখনো আবার অতি লোভে। কয়েকটি দৃষ্টান্ত:
(ক) সৃষ্টির সূচনায় আদম (আ.)-এর উচ্চ সম্মান দেখে শয়তান হিংসায় জ্বলে উঠেছিল। আদম (আ.)-এর প্রতি সম্মানের সিজদা করতে বলা হলে সে তা অস্বীকার করে এবং কুযুক্তি দেখিয়ে বলে—‘আমি আগুনের তৈরি আর আদম মাটির তৈরি। অতএব, আগুন কখনো মাটিকে সিজদা করতে পারে না।’ এভাবে হিংসা ও অহমিকা প্রদর্শন করে সে আল্লাহর হুকুম মানতে অস্বীকার করে; পরিণামে চিরকালের জন্য বিতাড়িত হয় জান্নাত থেকে।
(খ) একইভাবে আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল কাঙ্ক্ষিত নারীকে না পেয়ে হিংসাবশে হত্যা করে তার ভাই হাবিলকে।
(গ) ইহুদিদের ধারণা ছিল, শেষ নবীর আগমন হবে তাদের বংশ থেকে। তা না হওয়ায় তারা খেপে যায় এবং নবীজিকে নিয়ে হিংসা করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আহলে কিতাবের মধ্যে বহু লোক চায় তোমাদের ঈমান আনার পরে কুফরিতে ফিরিয়ে নিতে, তাদের কাছে সত্য প্রকাশিত হওয়ার পরও—শুধু বিদ্বেষবশত।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১০৯)
(ঘ) শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে সত্য বলে স্বীকার করার পরও আবু জাহল তাঁকে মেনে নেয়নি, নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে। মহানবী (সা.) বনু মখজুম গোত্রে (আবু জাহলের গোত্র) জন্ম না নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বনু হাশেম গোত্রে; এ কারণে সে হিংসার আগুনে পুড়ে মরে।
(ঙ) ভাইদের হিংসার শিকার হয়েছিলেন নবী ইউসুফ (আ.)। বাল্যকালে ইউসুফ (আ.) যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার বৃত্তান্ত শুনে পিতা তার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং অজানা আশঙ্কায় তাকে সর্বক্ষণ চোখের ওপর রাখতেন। এতে বিমাতা ভাইয়েরা তার প্রতি হিংসায় জ্বলে ওঠে, সিদ্ধান্ত নেয় শিশু ইউসুফকে হত্যা করার। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে নাজিল হয় সুরা ইউসুফ।
হিংসুক থেকে বাঁচার পথ
প্রথমত, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো বেশি বেশি পড়া। সুরা ফালাক ও নাসের আমলের সঙ্গে কোরআনে বর্ণিত এই দোয়াটিও পড়া যায় : ‘হে আমাদের রব! আমাদের ও আমাদের সেসব ভাইকে তুমি ক্ষমা করো। যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর তুমি আমাদের অন্তরে মুমিনদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বিদ্বেষ সঞ্চার কোরো না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই তুমি স্নেহশীল ও দয়াবান।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১০)
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা থাকলে প্রতিরোধ করা। যেমন—মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে রাসুল (সা.) পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং অবশেষে মদিনা থেকে তাদের বহিষ্কার করেছিলেন।
তৃতীয়ত, সত্য প্রকাশ করে দেওয়া, হিংসুক ব্যক্তি বা দলকে এড়িয়ে চলা এবং তাদের শাস্তির বিষয়টি আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা। যেমন—হিংসুক ইহুদিদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের ক্ষমা করো ও উপেক্ষা করে চলো, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর (চূড়ান্ত) নির্দেশ দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে ক্ষমতাবান।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১০৯)
আল্লাহ সবাইকে সুমতি দিন। আমিন।