৭ দফা দাবিতে বিভাগে তালা, সুইসাইড নোট রেখে নিখোঁজ জাবি শিক্ষার্থী
ছবিঃ সংগৃহীত
শিক্ষকেরা একাডেমিক নিপীড়ন চালিয়েছেন ও অসহযোগিতা করেছেন—সহপাঠী নিখোঁজ হওয়ার পর এমন অভিযোগ তুলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ফটকে তালা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সুইসাইড নোট লিখে নিখোঁজ হওয়া ওই বিভাগের শিক্ষার্থীর নাম কাজী মো. মোহাইমিনুল ইসলাম। তাঁর সহপাঠীরা ৭ দফা দাবি তুলেছেন, যার একটি হলো ১২ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে খুঁজে বের করা।
প্রক্টরের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীরা সোমবার (১২ অক্টোবর) রাত দেড়টার দিকে, অর্থাৎ দিনের প্রথম প্রহরে, ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগে তালা লাগান। দাবি না মেটা পর্যন্ত তালা খোলা হবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
৫০তম ব্যাচের এই শিক্ষার্থী জাবির মীর মশাররফ হোসেন হলের আবাসিক ছাত্র; হলটির ‘এ’ ব্লকের ১১০ নম্বর কক্ষে থাকতেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সূত্র বলছে, রবিবার (১১ অক্টোবর), অর্থাৎ গতকাল, বিকেল ৩টা ৮ মিনিটে মোহাইমিনুল মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকাগামী বিআরটিসি বাসে ওঠেন। পরে তিনি ঢাকার কাটাবনে নেমে যান বলে জানা গেছে। তারপর থেকে তাঁর আর কোনো সন্ধান মিলছে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে সাভার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে, আর সাভার ও আশুলিয়া থানা একযোগে কাজ করছে।
সহপাঠীরা অভিযোগ করছেন, স্নাতক ফাইনালে একটি কোর্সে অকৃতকার্য হন মোহাইমিনুল, আর এরপর বিশেষ পরীক্ষাকে ঘিরে দীর্ঘ সময় ধরে ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছিল তাঁর। তাঁদের ভাষ্য, দরকারি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করার পরও যথাসময়ে বিশেষ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি তিনি। নিজের ব্যাচের সঙ্গে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও সেটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিষয়টির সমাধানে বারবার শিক্ষকদের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো ফল মেলেনি। একেবারে শেষ মুহূর্তে বিভাগ জানিয়ে দেয়, পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়; এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, যা তাঁর সুইসাইড নোটেও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
নিজের কক্ষে রাখা নোটে শিক্ষকদের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ জানিয়ে মোহাইমিনুল লিখেছেন, “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আমার হাতে মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো অপশন নেই। কারণ তারা আমাকে এই দিকে ঠেলে দিয়েছে… ৬ মাস নাটক করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে আমাকে।” আরেকটি চিরকুটে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, ছোট ভাইকে যেন তুরস্কে পাঠানো হয়; সেই সঙ্গে বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করা টাকার হিসাব এবং তা শোধ করার নির্দেশনাও লিখে রেখেছেন।
একজন সহপাঠীর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া আর শিক্ষকদের দায়ী করার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ৭ দফা দাবি সামনে এনেছেন শিক্ষার্থীরা। সেগুলো হলো—১২ ঘণ্টার মধ্যে মোহাইমিনুলের সন্ধান বের করা; দায়ীদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন; বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক হোসাইন মোহাম্মদ সায়েম ও ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক আবু সাদাত মোহাম্মদ শামের পদত্যাগ; সংশ্লিষ্ট কোর্সের উত্তরপত্রের পুনর্মূল্যায়ন; কোনো শিক্ষার্থী কিংবা ব্যাচকে হয়রানি করা বন্ধ; ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের অবস্থান নিশ্চিত করা; ছাত্র সংসদকে কার্যকর করা এবং শিক্ষক মূল্যায়নের পদ্ধতি চালু করা।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঢাকা জেলা পুলিশ এবং গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে উদ্ধার তৎপরতার সার্বিক তদারকি করছেন তিনি। মোহাইমিনুলের পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়েও দরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে নোটে তোলা অভিযোগগুলো তদন্তে কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে।