মার্কিন জনগণের উদ্দেশে আইআরজিসির দীর্ঘ খোলা চিঠি
ছবিঃ সংগৃহীত
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কয়েক ডজন পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ চিঠি প্রকাশ করেছে, যা সরাসরি মার্কিন জনগণকে উদ্দেশ করে লেখা। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতি, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আমেরিকান জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা রয়েছে চিঠিটিতে।
এক সংবাদ সম্মেলনে আইআরজিসির ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, চিঠিটি মূলত মার্কিন জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনেরই একটি প্রয়াস। নিজেদের চারপাশের পরিস্থিতি, সরকারের কর্মকাণ্ড ও দেশটির সামরিক বাহিনীর ভূমিকার দিকে আরও মনোযোগ দিতে এতে আমেরিকানদের প্রতি আহ্বান রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিকই জানেন না মার্কিন সামরিক বাহিনী কী কী ‘অপরাধ’ করছে বলে ইরান মনে করে—এমন দাবি মোহেবির। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; আইআরজিসির ধারণা, ইরানের সঙ্গে দেশটির বিরোধের পেছনেও এগুলোর প্রভাব আছে।
মার্কিন জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের আহ্বান
মার্কিন জনগণের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার আহ্বান এসেছে আইআরজিসির তরফে। মোহেবি বলেন, এ অঞ্চল সম্পর্কে আমেরিকানদের জানা নেই; একটি প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন, যেখানে তাদের সঙ্গে কথা বলা যাবে। তিনি জানান, মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগে ইরান প্রস্তুত রয়েছে, আর তারাও ইচ্ছা করলে যোগাযোগ করতে পারেন।
মোহেবি বলেন, দুই দেশের বিরোধ ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা গড়ে উঠতে পারে, যদি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ থাকে।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার
আইআরজিসির মুখপাত্র মার্কিন জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রসঙ্গও তোলেন। মোহেবি বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা ইরান কখনোই করেনি; ভবিষ্যতেও সে পথে যাওয়ার কোনো অঙ্গীকার নেই। তিনি এ-ও উল্লেখ করেন যে, এ বিষয়ে ইরান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের তীব্র বিরোধ দীর্ঘদিনের। ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা উদ্বেগ জানিয়ে আসছে; বিপরীতে তেহরানের বরাবরের বক্তব্য, তাদের কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে।
সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
আইআরজিসিকে কেন ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলো, সে কারণ নিজেদের সরকারের কাছে জানতে চাইতে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান মোহেবি। তার দাবি, সংগঠনটি সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ইরান ও এ অঞ্চলে ‘লুটপাট’ ঠেকানোর কারণেই।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও উত্থাপন করেন মোহেবি। তার ভাষ্য, স্কুল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ ও গির্জায় বোমা হামলার মতো ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জড়িত হয়েছে; অথচ অনেক মার্কিন নাগরিকই এসব বিষয়ে জানেন না।
আইআরজিসির বক্তব্য ও দাবিকে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে বিবেচনা করা দরকার। অভিযোগগুলোর বিষয়ে মার্কিন সরকারের অবস্থান কী, সে কথা এ বক্তব্যে উল্লেখ নেই।
‘বিশ্বজুড়ে ৮০০ ঘাঁটির প্রয়োজন নেই’
আইআরজিসির মুখপাত্র প্রশ্ন তোলেন মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়েও। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮০০ সামরিক ঘাঁটি বিশ্বজুড়ে থাকার কোনো দরকার নেই। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ হলো ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বার্ষিক বাজেট।
যুক্তরাষ্ট্রের শাসকেরা নিজেদের জনগণের কথা যথেষ্ট বিবেচনায় নেন না এবং প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষের বসবাস দারিদ্র্যসীমার নিচে—দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে এমন দাবি করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বদলানোর সময় এসেছে কি না—এমন প্রশ্ন রাখেন মোহেবি। তার যুক্তি, সামরিক হামলার পেছনে ব্যয় করা অর্থের মাত্র ১০ শতাংশ বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তায় খরচ করা হলে আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠত।
জনগণকে লক্ষ্য করে তেহরানের বার্তা
মার্কিন সরকারের পাশাপাশি সে দেশের জনগণের কাছেও সরাসরি ইরানের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে আইআরজিসির এই দীর্ঘ বক্তব্যকে। সামরিক সংঘাত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি, সামরিক ঘাঁটি, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে তেহরানের অবস্থান এতে উঠে এসেছে। সরকারের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে মার্কিন জনগণের প্রতি আহ্বানও রয়েছে বক্তব্যে।
চিঠিটি কয়েক ডজন পৃষ্ঠার বলে এর সব বিষয়ের বিস্তারিত পর্যালোচনা এখনো শেষ হয়নি; ফলে এতে আর যেসব বক্তব্য ও দাবি রয়েছে, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র মিলতে আরও সময় লাগবে। তবে মুখপাত্রের কথায় এটা স্পষ্ট যে কেবল মার্কিন সরকার নয়, দেশটির সাধারণ জনগণের সঙ্গেও ইরান সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের বার্তা দিতে চাইছে। ইঙ্গিত মিলেছে, এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো চলমান উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন জনমতকে ওয়াশিংটনের নীতি নিয়ে আলোচনায় আনা। সূত্র: আল-জাজিরা